আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় সীমাবদ্ধতার কারণে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান, ড্রোন পরিচালনা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার মধ্যে এই পরিস্থিতি ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংকের উন্নত সংস্করণ স্টারশিল্ডে আকস্মিক বিধিনিষেধের কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী আগাম কোনো সতর্কবার্তা পায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা কিছু স্যাটেলাইট টার্মিনালের সংযোগে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে দ্রুতগতির ড্রোন পরিচালনা ও রুশ-অধিকৃত এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আগাম সতর্কতা ছাড়াই সীমাবদ্ধতার অভিযোগ
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেস্করেস্তনভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, নতুন সীমাবদ্ধতার বিষয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী আগে থেকে কিছু জানত না। এর ফলে কয়েকটি সামরিক মিশন ব্যাহত হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ পরিস্থিতি সামরিক সরবরাহ, ড্রোন পরিচালনা, সেনাদের কার্যক্রম এবং মাঝারি পাল্লার আক্রমণে জটিলতা তৈরি করছে।
স্টারলিংক ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রুশ আক্রমণের মুখে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় করতে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় স্পেসএক্স এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। বিধিনিষেধ আরোপের পেছনে রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাড়ছে টানাপোড়েন
স্টারলিংক নিয়ে এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা বন্ধ করার জন্য কিয়েভের ওপর চাপ দিচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণস্থল শনাক্ত করতে এবং সম্ভাব্য আঘাতের লক্ষ্য ও সময় সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে ইউক্রেনকে সহায়তা করে।
জেলেনস্কি অবশ্য অভিযোগ করেছেন, কিয়েভে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে মিত্রদের কাছ থেকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। ফলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা ও গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রুশ হামলায় বিদ্যুৎহীন ছয় লাখের বেশি মানুষ
একই সময়ে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। জেলেনস্কির দাবি, রুশ বাহিনী কিয়েভ ও খারকিভ লক্ষ্য করে ১২০টির বেশি ড্রোন এবং ৩৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এসব হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। বুধবার ভোরে ছয় লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বলে জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
কিয়েভের একটি আবাসিক ভবনেও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালান।
জেলেনস্কির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত কথিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র আওতায় থাকার কথা ছিল এসব অবকাঠামোর। কিন্তু রাশিয়ার হামলায় সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে ঠিক কী শর্তে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। রাশিয়ার পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটির বিস্তারিত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ড্রোন প্রতিরক্ষাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
স্টারলিংক সেবার সীমাবদ্ধতা শুধু আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানেই নয়, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
রাশিয়া জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। এসব ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেন ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করে, যেগুলোর পরিচালনা ও যোগাযোগে স্টারলিংক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কির উপদেষ্টা বেস্করেস্তনভ।
ইউক্রেনের দাবি, স্যাটেলাইট সংযোগে সীমাবদ্ধতা থাকলে দ্রুতগতির ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ও লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা কমতে পারে। এতে রুশ ড্রোন প্রতিহত করার প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কিয়েভে পৌঁছাতে পারে। ফলে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া গেলেও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় খুবই সীমিত থাকে। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের জন্য মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়ে আসছে।
যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
রাশিয়া ও ইউক্রেন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখসারির অবস্থানে বড় পরিবর্তন না এলেও বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামরিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ইউক্রেনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্র ও সেনাসংখ্যা নয়, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্টারলিংক সীমাবদ্ধতার কারণ ও এর পরিধি সম্পর্কে স্পেসএক্সের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট নয়। তবে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে এর প্রভাব এবং রুশ হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সূত্র: CNN, Reuters, Associated Press
