পরিবেশ ডেস্ক
প্রকৃতির আনাচে-কানাচে এমন অনেক উদ্ভিদ রয়েছে, যেগুলো খুব সাধারণ বলেই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তেমনই একটি লতাগাছ আগমুখী। বাড়ির পুরোনো বেড়া, ঝোপঝাড় কিংবা পতিত জমিতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদটি দেখতে সাধারণ হলেও লোকজ চিকিৎসা ও উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণায় এর বেশ কিছু সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
ময়মনসিংহের কাচারি ঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে এ বছরের ১২ জুন এমনই একটি আগমুখী লতার দেখা মেলে। সরু লতায় ছোট সবুজ ও পাকা অবস্থায় লালচে ফল ধরে। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Cucumis maderaspatanus; এটি কুমড়া জাতীয় উদ্ভিদের পরিবার Cucurbitaceae-এর সদস্য। উদ্ভিদটির আরেকটি স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নাম Mukia maderaspatana হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
দেখতে কেমন আগমুখী
আগমুখী একটি সরু, নরম ও মাটিতে ছড়িয়ে বেড়ে ওঠা লতাগাছ। এর কাণ্ডে সূক্ষ্ম লোম থাকে এবং প্রতিটি গিঁট থেকে সরু আকৃতির শুঁড় বের হয়। এসব শুঁড়ের সাহায্যে গাছটি আশপাশের অন্য উদ্ভিদ, বেড়া কিংবা খুঁটি আঁকড়ে ওপরে উঠে যায়।
পাতা কিছুটা তীরের ফলার মতো দেখতে। সাধারণত পাতায় তিন থেকে পাঁচটি খাঁজ বা খণ্ড থাকে। পাতার দুই পাশই তুলনামূলক খসখসে এবং কিনারায় হালকা দাঁতের মতো অংশ দেখা যায়।
এর ফুল ছোট ও উজ্জ্বল হলুদ রঙের। পাতার গোড়ার দিক থেকে এককভাবে কিংবা কয়েকটি ফুল একসঙ্গে ফুটতে দেখা যায়। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ফুল ও ফলের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে।
ফল আকারে খুব ছোট, প্রায় মার্বেলের মতো গোল। কাঁচা অবস্থায় ফল সবুজ এবং পরিপক্ব হলে গাঢ় লাল বা সিঁদুরে রঙ ধারণ করে। ফলের ভেতরে থাকে চ্যাপ্টা ও মসৃণ বীজ।
লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহার
বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আগমুখীর পাতা ও শিকড় লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় ভেষজ চর্চায় সর্দি-কাশি, হজমের সমস্যা, পেট ফাঁপা, কিছু প্রদাহজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতায় এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব ব্যবহার মূলত ঐতিহ্যগত জ্ঞানভিত্তিক; কোনো রোগের চিকিৎসায় এটি প্রতিষ্ঠিত বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
গবেষণায়ও আগ্রহ বাড়ছে
আগমুখী নিয়ে আধুনিক গবেষণায় এর বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ও জৈবিক কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে। উদ্ভিদটির পাতার নির্যাসে ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ, স্যাপোনিনসহ বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। কিছু পরীক্ষাগারে পরিচালিত গবেষণায় এর নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতার সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার বড় অংশই প্রাথমিক বা পরীক্ষাগারভিত্তিক। ফলে নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় আগমুখী কতটা কার্যকর—তা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
খাবারেও ব্যবহার
ভারতের কিছু অঞ্চলে আগমুখীর কচি পাতা ও অন্যান্য নরম অংশ স্থানীয় খাবারে ব্যবহার করার প্রচলন রয়েছে। ভাজি, স্যুপ কিংবা বিভিন্ন স্থানীয় পদে এটি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।
প্রকৃতিতেও রয়েছে ভূমিকা
আগমুখীর মতো দেশীয় লতাগাছ প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্ভিদ ঝোপঝাড় ও মাটির আচ্ছাদন তৈরিতে ভূমিকা রাখে এবং নানা ধরনের পতঙ্গকে আকৃষ্ট করে, যা পরাগায়নে সহায়তা করতে পারে।
সাধারণ চোখে আগাছার মতো মনে হলেও আগমুখী প্রকৃতির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যের একটি অংশ। এর ভেষজ ব্যবহার, রাসায়নিক উপাদান ও সম্ভাব্য ঔষধি গুণ নিয়ে আরও গবেষণা হলে ভবিষ্যতে উদ্ভিদটি সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।
লেখক: বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ
