রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই নতুন সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আগের সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে এ প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন। তখন পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হয়েছিল তাঁকে।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের কিছু মিল রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাজ্যের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান।
জিয়াউর রহমানের সময়েও ছিল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও দলীয় কাঠামোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান সেই প্রশাসনিক জনবলকে কাজে লাগিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। লেখকের মতে, তিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীল অর্থনীতি, আত্মনির্ভরশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ আমলের প্রশাসন নিয়ে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আবারও একই ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন লেখক। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। ওই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উঠে আসে।
তবে লেখকের মতে, আগের সরকারের সময়ে চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া এবং স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো কর্মকর্তা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন, কেউ রাজনৈতিক চাপের মুখে কাজ করেছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে বেআইনি নির্দেশ বাস্তবায়নের অভিযোগ থাকতে পারে। তাই সবাইকে একইভাবে বিবেচনা না করে ব্যক্তিগত ভূমিকা ও দায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাবের বিষয়টিও লেখায় তুলে ধরা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগের ২৩ জুলাই ২০২৫ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে লেখক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারি চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল।
লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সবাইকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা হলে প্রশাসনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তারেক রহমানের প্রশাসনিক কৌশল
লেখকের পর্যবেক্ষণে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনিক দর্শন অনুসরণ করছেন বলে মনে করেন মাহাবুবুর রহমান।
লেখায় ২৫ এপ্রিল ২০২৬ সালে বিআইএএমের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গও এসেছে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের মেধা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের মতে, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন নিশ্চয়তা তৈরি করা জরুরি যে, সততা ও আইন মেনে দায়িত্ব পালন করলে তাঁরা সুরক্ষা পাবেন। অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়ম করলে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।
এতে কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত হবেন এবং প্রশাসনে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমবে।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রশাসনের ভূমিকা
বর্তমানে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন।
ভূমিসেবা, আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন প্রকল্প ও নাগরিক সেবা সচল রাখতে অভিজ্ঞ প্রশাসনিক জনবল প্রয়োজন। তাই রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বকে মূল্যায়নের ভিত্তি করা উচিত বলে মনে করেন লেখক।
তাঁর মতে, পুরো প্রশাসনকে সন্দেহের চোখে দেখলে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। আবার প্রশাসনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
জিয়াউর রহমান থেকে তারেক রহমান: রাষ্ট্র গঠনের চ্যালেঞ্জ
লেখক জানান, লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। বক্তব্যে তিনি ভবিষ্যতে যাতে কেউ দেশের স্বাধীনতা, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিতও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেশ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। তবে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের সময়ের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে বলে মনে করেন মাহাবুবুর রহমান।
লেখকের মতে, রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রশাসনের অভিজ্ঞ জনবলকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এসে জনগণের সেবায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক সংস্কার, দক্ষ জনবলের সঠিক ব্যবহার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা এবং দায়িত্বশীলতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা জরুরি।
লেখক: ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তরাজ্যের আইনজীবী ও রয়টার্সের সাবেক সাংবাদিক।

