ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী। একসময় তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত থাকলেও কয়েক দশকের সংঘাত, সামরিক অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক সমর্থনের মাধ্যমে তারা ইয়েমেনের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

হুতিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকাতেও তাদের উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে তাদের তৎপরতা বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হুতিরা কারা

হুতিরা মূলত জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত। জায়দিরা শিয়া ইসলামের একটি শাখা, আর ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সুন্নি। উত্তর ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে বসবাসকারী জায়দিদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নব্বইয়ের দশকে হুতি আন্দোলনের উত্থান ঘটে।

হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। সংগঠনটির নামকরণ করা হয় ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নাম অনুসারে। তাঁর ছেলে হুসেইন আল-হুতি আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্বে আসেন তাঁর ভাই আবদুলমালিক আল-হুতি।

আবদুলমালিকের নেতৃত্বে হুতিরা ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।

২০১৪ সালে বড় উত্থান

হুতিদের সবচেয়ে বড় উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। ওই বছর তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। সংঘাত দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয় এবং ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।

এর আগে ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে জড়ায়। ২০০৯-১০ সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের সংঘর্ষ হয়। পরে ২০১২ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তারা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আন্দোলনে অংশ নেয়।

পরবর্তীতে হুতিদের সঙ্গে সালেহর জোট হলেও আবার বিরোধ সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে হুতিদের হাতে সালেহ নিহত হন।

ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক

হুতিদের ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মতো সংগঠন রয়েছে।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান হুতিদের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দেয়। তবে ইরান অতীতে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও সংগঠনটি নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রেখেছে। সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে অবশ্য ইরানের ওপর তাদের নির্ভরতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইসরায়েল ও লোহিত সাগরে হামলা

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর হুতিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২০২৪ সাল থেকে তারা লোহিত সাগরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে। তাদের দাবি, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সমর্থনেই তারা হামলা চালাচ্ছে।

এসব হামলার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজকে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।

বাব আল-মানদেব কেন গুরুত্বপূর্ণ

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ খালের মাধ্যমে এই জলপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে বাব আল-মানদেব এলাকায় হুতিদের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের তেল পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে বাব আল-মানদেব নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে হুতিদের বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে উপকূলীয় এলাকা ও কৌশলগত দ্বীপগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ার দাবি করা হয়েছে।

কেন হুতিদের গুরুত্ব বাড়ছে

বর্তমানে হুতিদের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে প্রভাব বিস্তার করতে পারায় হুতিরা শুধু ইয়েমেনের রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version