সাইরেন বাজিয়ে বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলা, হ্যান্ডমাইকে ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে ডাকাডাকি, বাইরে কালো পোশাকে র্যাব সদস্যদের অবস্থান এবং সঙ্গে ডগ স্কোয়াড—এরপর একটি কক্ষে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সামনে ল্যাপটপে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা। পরে বাইরে থেকে দরজা ভেঙে একে একে তাদের বের করে আনার মাধ্যমে ‘জঙ্গি আস্তানায় অভিযান ও উদ্ধার’ নাটক সাজানো হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন নূর-ই-আলম।
নূর-ই-আলমের দাবি, দীর্ঘদিন গোপনে আটক রাখার পর তাকে এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে এভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানো হয়। পরে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনসহ বিভিন্ন কঠোর আইনে মামলা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (JIC)-সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৮ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেন নূর-ই-আলম। বিচারপতি মো. মহিতুল হক এনাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে তিনি এ মামলার সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সারওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী।
২০১৬ সালে নিখোঁজ হওয়ার দাবি
সাক্ষ্যে নূর-ই-আলম জানান, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল নীলফামারীর নিজ বাড়ি থেকে তিনি নিখোঁজ হন। এরপর তাকে JIC-সহ বিভিন্ন আটককেন্দ্রে রাখা হয়। একই বছরের ৭ আগস্ট তাকে আরেকটি সংস্থার একটি সেলে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে নেওয়ার পর তার হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয় এবং কালো রঙের একটি পোশাক দেওয়া হয়। পোশাক পরিবর্তনের পর আবার হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে তাকে একটি কক্ষে নেওয়া হয়।
নূর-ই-আলম বলেন, ওই সেলটির আকার ছিল প্রায় ৯ ফুট বাই ৩ ফুট। পাশাপাশি দুই স্তরে মোট ছয়টি সেল ছিল। তিনটি সেলের জন্য একটি করে স্ট্যান্ড ফ্যান ছিল। দিনে তিনবার খাবারের জন্য তাকে সেল থেকে বের করা হতো এবং পাশে একটি বাথরুম ছিল।
তিনি জানান, বাথরুমে যাওয়ার সময় দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাইরে ‘RAB-4’ লেখা দেখতে পান। পরে খাবার খাওয়ার সময় অন্য আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, সেখানে তাজুল ইসলাম, রাজিব, ডা. ইকবাল ও রাকিব নামে আরও কয়েকজন ছিলেন।
স্ট্যান্ড ফ্যানের নিচেও ‘RAB-4’ লেখা দেখতে পাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তাকে গোপনে আটক রাখা হয়েছে।
RAB-10-এর সংকীর্ণ সেলে নেওয়ার অভিযোগ
নূর-ই-আলমের সাক্ষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস সেখানে থাকার পর তাকে ও তাজুল ইসলামকে সেল থেকে বের করে বাথরুমে নেওয়া হয়। এরপর হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে আগের পোশাক পরতে দেওয়া হয়। পরে আবার চোখে টুপি পরিয়ে গাড়িতে করে অন্য একটি স্থানে নেওয়া হয়।
প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা গাড়ি চলার পর তাদের একটি সেলে নেওয়া হয়। নূর-ই-আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি ছিল র্যাব-১০-এর একটি সেল। এর প্রস্থ ছিল প্রায় আড়াই থেকে তিন ফুট এবং দৈর্ঘ্য সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুট। সেলের ভেতরেই ছিল বাথরুম ও পানির কল। সামনে ছিল সিসিটিভি ক্যামেরা।
তিনি জানান, পাশের সেলে ছিলেন নাজিম উদ্দিন, তাজুল ইসলাম, আবু জার গিফারি ও সামি।
‘অভিযানের নাটক’ সাজানোর অভিযোগ
নূর-ই-আলমের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে তাদের সবাইকে সেল থেকে বের করা হয়। হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে গলা পর্যন্ত হুড পরানো হয়। এরপর তাদের গাড়িতে তোলা হয়।
প্রায় আট থেকে ১০ ঘণ্টা গাড়ি চলার পর একটি স্থানে তাদের নামানো হয়। নূর-ই-আলম জানান, আশপাশের উঁচু ভবন থেকে যাতে কেউ তাদের দেখতে না পারে, সেজন্য মাথার ওপর ছাতা ধরে তাদের একটি ভবনের ভেতরে নেওয়া হয়।
কয়েক দিন সেখানে রাখার পর নূর-ই-আলম, গিফারি ও সামিকে একটি গাড়িতে এবং নাজিম ও তাজুলকে অন্য গাড়িতে নেওয়া হয়। প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর তাদের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে একটি বিছানায় বসানো হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর নাজিম ও তাজুলকেও সেখানে আনা হয়। এ সময় কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধরনের ভারী জিনিসপত্র এনে কক্ষের মেঝেতে রাখেন। এরপর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নূর-ই-আলম বলেন, একপর্যায়ে একজন ফোন করে বলেন, ‘স্যার, সব ঠিক আছে।’ এরপর নিচে র্যাবের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে টহল দিতে থাকে এবং কর্মকর্তারা হ্যান্ডমাইকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে থাকেন।
তার অভিযোগ, প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে সেখানে একটি ‘জঙ্গি উদ্ধার অভিযান’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। একপর্যায়ে বাইরে থেকে দরজা ভাঙার অভিনয় করা হয়। ভবনের বাইরে সাংবাদিকরা যাতে ভেতরের দৃশ্য ধারণ করতে না পারেন, সে জন্য জানালাও আড়াল করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ল্যাপটপে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরির অভিযোগ
নূর-ই-আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে কক্ষের ভেতরে একটি ল্যাপটপে আগুন দেওয়া হয় এবং ধোঁয়া তৈরি করা হয়। তিনি কর্মকর্তাদের কথাবার্তা থেকে বিষয়টি বুঝতে পারেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান।
তারপর চট্টগ্রাম র্যাব-৭-এর তৎকালীন প্রধান কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ ওই ভবনে আসেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন নূর-ই-আলম।
তিনি জানান, কর্মকর্তারা তাদের চোখ খুলতে বলেন। চোখ খোলার পর তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ, বলবিয়ারিং, তার, পেরেক ও বই দেখতে পান।
নূর-ই-আলমের দাবি, কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন তাদের এসব জিনিসের একটি তালিকা দিতে বলেন এবং সেগুলো নিচে গিয়ে সাজিয়ে রাখতে নির্দেশ দেন। এরপর তাদের দ্রুত নিচে নিয়ে র্যাবের গাড়িতে তোলা হয়।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে সাংবাদিকরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাদের কাছাকাছি যেতে দেওয়া হয়নি। পরে নূর-ই-আলমসহ অন্যদের র্যাব-৭ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
কারাগারে পাঠানোর পর মামলা
নূর-ই-আলম জানান, ওই দিন রাত ৩টার দিকে তাকে ও অন্যদের আকবর শাহ থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠায়।
তার দাবি, তার সঙ্গে গিফারি ও সামির বিরুদ্ধে দুটি করে মামলা এবং তাজুল ও নাজিমের বিরুদ্ধে তিনটি করে মামলা করা হয়। এসব মামলায় র্যাব ও পুলিশ পৃথকভাবে তাদের তিন দিন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অর্থাৎ মোট ছয় দিন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে তিনি জানান।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের সময় এএসপি রুহুল আমিন তাকে বলেছিলেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন নূর-ই-আলম, ‘ডিজিএফআইয়ের লোকজন তোমাকে বাড়ি থেকে নিয়ে গেছে। প্রথমে JIC-তে রাখা হয়েছিল। এরপর TFI সেলে রাখা হয়। পরে আমাদের জেলে পাঠানো হয়েছে।’
নূর-ই-আলম আরও জানান, একটি মিথ্যা মামলায় প্রায় ১১ মাস কারাগারে থাকার পর বর্তমানে তিনি হাইকোর্টের আদেশে জামিনে রয়েছেন।
নিখোঁজের পর পরিবারের নানা উদ্যোগ
সাক্ষ্যে নূর-ই-আলম জানান, তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার পর তার মা নীলফামারী সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কয়েক দিন পর আদালতে অপহরণের মামলা করেন তিনি।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসক ও নীলফামারী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া এবং সংবাদ সম্মেলন করার কথাও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তার মা সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান।
নূর-ই-আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে নীলফামারী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা চৌরঙ্গী মোড়ে মানববন্ধন করেন। ওই সময় কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী নূর স্যারকে পুলিশ লাঠিপেটা করে নিয়ে যায় বলেও তিনি দাবি করেন।
সাক্ষ্যে নূর-ই-আলম তার নিখোঁজের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী এবং ডিজিএফআই ও র্যাবের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করেন। তিনি অভিযুক্তদের শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের উপস্থিতি
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে মিজানুল ইসলাম ও শেখ মাহদি উপস্থিত ছিলেন। প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মামলাটি জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসংক্রান্ত। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া নূর-ই-আলমের বক্তব্য তার সাক্ষ্য ও অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
