দেশজুড়ে চলমান লোডশেডিংয়ের প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবায়। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কোথাও অস্ত্রোপচারের মাঝপথে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, কোথাও নেবুলাইজার বন্ধ থাকছে। ব্যাহত হচ্ছে এক্স-রে, ইসিজি ও প্যাথলজি পরীক্ষাও। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৫৮ দিনের শিশু হাফসা জাহানের চিকিৎসায় দিনে একাধিকবার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা নিয়মিত করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে বন্ধ থাকছে ওয়ার্ডের বৈদ্যুতিক পাখা। গরমে শিশুটির শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে তার মাকে।

চট্টগ্রামের পটিয়া ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের হাসপাতালেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। পটিয়ায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছর বয়সী এক শিশুকে দিনে ছয়বার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও একদিনে দেওয়া হয়েছে তিনবার। রায়পুরে চার বছর বয়সী এক শিশুরও নেবুলাইজার দেওয়ার সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ না থাকায়।

অস্ত্রোপচারের সময়ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সম্প্রতি অস্ত্রোপচার শুরুর পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরে মোবাইলের আলো ব্যবহার করে এবং দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করে জেনারেটর চালিয়ে অস্ত্রোপচার শেষ করা হয়।

হাসপাতালটির স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ হাসপাতালের প্রায় সব কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়ে। অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। জেনারেটর মেরামত করা হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির বরাদ্দ না থাকায় তা নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটছে। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে দায়িত্বে থাকা নার্সদের একজন জানান, নিয়মিত চার-পাঁচটি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হলেও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

হাসপাতালের কর্মকর্তারা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু জেনারেটরে প্রয়োজনীয় পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সবসময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালানো সম্ভব হয় না। এতে রোগীর অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থানে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

জেনারেটর আছে, জ্বালানি নেই

লোডশেডিং মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর থাকলেও অনেক জায়গায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না জ্বালানির অভাবে।

মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র জেনারেটরটি জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে। এটি চালাতে প্রতিদিন আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হলেও তা কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নেই।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও জেনারেটর থাকলেও ডিজেল বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনের সময় সেটি চালানো যাচ্ছে না।

পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবার কোনো জেনারেটরই নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে প্যাথলজি পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হয় এবং রোগীদের বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষা করতে হয়।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ চালাতে হয়। চিকিৎসকেরা মোবাইল ফোনের টর্চের আলোতেও রোগী দেখেন। জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি আইপিএস থাকলেও তা দিয়ে সীমিত আলো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

এক্স-রে করাতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে

লোডশেডিং ও কম ভোল্টেজের কারণে সবচেয়ে বেশি বিঘ্ন ঘটছে পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এক্স-রে মেশিন মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত এক রোগী সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে করাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করান। সরকারি হাসপাতালে যেখানে খরচ হওয়ার কথা ছিল ৫৫ টাকা, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁকে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও কম ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে সেবা প্রায়ই বন্ধ থাকছে। চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে হাতের ভাঙা আঙুলের এক্স-রে করাতে আসা এক রোগী প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষা না করিয়েই ফিরে যান। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণেও এক্স-রে করাতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়েছেন রোগীর স্বজনেরা।

রোগীদের পাশে স্বজনদের হাতে পাখা

লোডশেডিংয়ে শুধু চিকিৎসা সরঞ্জামই বন্ধ হচ্ছে না, হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বরে আক্রান্ত এক তরুণ রোগীর পাশে তাঁর মা হাতপাখা নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শ্বাসকষ্টের রোগীদেরও একই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নেবুলাইজার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীর স্বজনেরা হাতে পাখা দিয়ে বাতাস করছেন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ীতে রোগী ও স্বজনেরা জানিয়েছেন, অনেক সময় দিনে-রাতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বাড়ছে।

জ্বালানি সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন

পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর প্রভাব হিসেবে দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে এবং এখন এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবাতেও।

গত শনিবার বিকেল ৩টার দিকে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াট। আগের দিন শুক্রবার সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট।

গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার তাদের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট। ওই সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত কমানো না গেলে হাসপাতালগুলোর জরুরি চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রমে আরও বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version