লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে, প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

লিভার বা যকৃতের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশেও হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের সংক্রমণ, ফ্যাটি লিভার, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয় এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা বাড়ানো, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি। অক্টোবর মাস বিশ্বজুড়ে লিভার ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়।

বিশ্বে লিভার ক্যানসারের পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে প্রায় ৯ লাখ মানুষ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। একই বছরে এ রোগে মারা যান প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে লিভার ক্যানসারে বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বে এ রোগের প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘটনা ঘটে এশিয়ায়।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, লিভার ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে যেসব কারণে বাড়ছে ঝুঁকি

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এ দুই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি বলে ধারণা করা হয়।

দীর্ঘদিন হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত থাকলে যকৃতে প্রদাহ ও ক্ষতি হতে পারে। একপর্যায়ে লিভার সিরোসিস তৈরি হলে ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

এ ছাড়া লিভার ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় হলো—

  • ফ্যাটি লিভার ও অতিরিক্ত ওজন

  • ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা

  • দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগ

  • মদ্যপান

এসব ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি লিভারের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কীভাবে শনাক্ত করা হয় লিভার ক্যানসার?

লিভার ক্যানসার শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর শারীরিক অবস্থা ও রোগের ইতিহাস বিবেচনা করে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, রক্তে আলফা-ফেটোপ্রোটিন (এএফপি) পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বায়োপসি।

তবে শুধু একটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচন করেন চিকিৎসক।

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। তাই যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগ বা হেপাটাইটিসের সংক্রমণ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত।

লিভার ক্যানসারের চিকিৎসা কী?

রোগের পর্যায়, টিউমারের অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।

চিকিৎসার পদ্ধতির মধ্যে থাকতে পারে অস্ত্রোপচার, লিভার প্রতিস্থাপন, টিউমারকেন্দ্রিক চিকিৎসা, টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই চিকিৎসা কার্যকর হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।

লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে করণীয়

লিভার ক্যানসার প্রতিরোধে ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—

হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিন: টিকা এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রয়োজনে হেপাটাইটিস পরীক্ষা করান: সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা করান।

ওজন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন: স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন।

মদ্যপান পরিহার করুন: মদ্যপান যকৃতের ক্ষতি করতে পারে। তাই এটি এড়িয়ে চলা ভালো।

নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।

লিভার ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো রোগ শনাক্তের মাধ্যমে এ রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে। তাই লিভারের স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version