রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে তিনি দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও সেখানে নিহিত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা এবং প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাব

১. নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ

প্রথম প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

২. সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক মানুষের ওপর সব ধরনের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিরাপদে ফেরার বিষয়ে আস্থা ফিরে পান।

৩. মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা

তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্যও আন্তর্জাতিক সহায়তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি হওয়া চাপও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

৪. ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি

চতুর্থ প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালত ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা

পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্যসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব অপরাধ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতা নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির বড় অবনতি ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে এবং মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করে মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আসার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।

দীর্ঘস্থায়ী সংকটে বাড়ছে চাপ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে মানবপাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিবছর নতুন প্রজন্ম বেড়ে ওঠায় দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মানবিক সহায়তায় ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। তাঁর মতে, শুধু বাংলাদেশ যেন অনির্দিষ্টকাল রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব বহন করে যায়—এমন পরিস্থিতিও গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগের কথা উঠে আসে। মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকুক। প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা, জবাবদিহি এবং প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা প্রস্তাবের মাধ্যমে এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version