মক্কার অন্ধকার যুগে আরবের বিভিন্ন গোত্রের মানুষ কাবাঘরে সমবেত হতো। সে সময় মক্কা থেকে সিরিয়ার দিকে যাওয়া প্রাচীন বাণিজ্যপথের পাশে বসবাস করত দুর্গম মরুভূমির গোত্র বনু গিফার। ইতিহাসে এই গোত্রটি একসময় দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই গোত্রেই জন্ম নিয়েছিলেন জুন্দুব ইবনে জুনাদাহ, যিনি পরবর্তীতে সাহাবি হজরত আবু জর আল-গিফারি (রা.) নামে পরিচিত হন।

তাওহিদের সন্ধানে আবু জর

ইসলামপূর্ব আরবের মূর্তিপূজা ও গোত্রীয় অন্ধতার সঙ্গে আবু জরের অন্তর একাত্ম হতে পারেনি। তাঁর মনে এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

এমন সময় তিনি খবর পেলেন, মক্কায় একজন ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর রাসুল হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছেন। সত্যের সন্ধানে আবু জর তাঁর ভাই উনাইসকে মক্কায় পাঠালেন বিষয়টি অনুসন্ধান করতে।

উনাইস মক্কায় গিয়ে গোপনে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর দাওয়াতের কথা শুনে ফিরে আসেন। তিনি আবু জরকে জানান, ওই ব্যক্তি মানুষকে ভালো চরিত্র ও সৎকর্মের শিক্ষা দেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকতে বলেন। তবে ভাইয়ের এই বর্ণনাতেও আবু জরের অনুসন্ধিৎসু মন তৃপ্ত হয়নি। তিনি নিজেই মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মক্কায় এসে আলী (রা.)-এর সঙ্গে পরিচয়

সামান্য খাবার ও পানির পাত্র সঙ্গে নিয়ে আবু জর একাই মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি কাবার আঙিনায় অবস্থান নেন। চারপাশের পরিস্থিতি ছিল তাঁর জন্য অপরিচিত এবং নবীজি (সা.)-এর দাওয়াতের বিরোধিতাও ছিল তীব্র।

এ অবস্থায় আলী (রা.) তাঁর প্রতি আতিথেয়তা দেখান। পরপর কয়েক দিন আবু জরের পরিচয় বা আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি কোনো প্রশ্ন করেননি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় দিনে আলী (রা.) জানতে চাইলে আবু জর নিজের মক্কায় আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, একজন নবীর আবির্ভাবের খবর শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এবং তাঁর বক্তব্য শুনতেই তিনি দূর দেশ থেকে এসেছেন। তখন আলী (রা.) তাঁকে আশ্বস্ত করেন এবং পরদিন নিজের অনুসরণ করতে বলেন।

নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যে ইসলাম গ্রহণ

পরদিন আলী (রা.)-এর অনুসরণ করে আবু জর (রা.) নবীজি (সা.)-এর কাছে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং কোরআনের আয়াত শুনতে পান।

সত্যের এই বাণী তাঁর অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর তিনি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। লেখাটিতে তাঁকে ইসলামের প্রাথমিক যুগের চতুর্থ বা পঞ্চম মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাবার চত্বরে প্রকাশ্যে তাওহিদের ঘোষণা

ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি (সা.) তাঁকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছু সময় নিজের বিশ্বাস গোপন রাখতে এবং নিজ গোত্রে ফিরে যেতে পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু জর (রা.) সত্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি কাবার আঙিনায় গিয়ে কোরাইশদের সামনে উচ্চকণ্ঠে আল্লাহর একত্ব এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর রাসুল হওয়ার সাক্ষ্য দেন। এতে কোরাইশরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে মারধর করে রক্তাক্ত করে ফেলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) এগিয়ে এসে আবু জরকে রক্ষা করেন। তিনি কোরাইশদের স্মরণ করিয়ে দেন যে বনু গিফারের অঞ্চল দিয়ে তাদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলা চলাচল করে। এ কারণে আবু জরকে হত্যা করলে তাদের বাণিজ্যিক পথও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

পরদিনও আবু জর (রা.) একইভাবে কাবার চত্বরে তাওহিদের ঘোষণা দেন। সেদিনও তিনি নির্যাতনের শিকার হন এবং আব্বাস (রা.) তাঁকে রক্ষা করেন।

নিজ গোত্রে ফিরে দাওয়াত

নবীজি (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী পরে আবু জর (রা.) নিজের গোত্র গিফারে ফিরে যান। প্রথমে তিনি তাঁর ভাই উনাইসকে ইসলামের দাওয়াত দেন। উনাইস ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তাঁদের মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও ইসলামের পথে আসেন।

ধীরে ধীরে গোত্রের আরও মানুষ আবু জরের আহ্বানে সাড়া দিতে শুরু করেন। লেখাটিতে বলা হয়েছে, নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরত করার আগেই গিফার গোত্রের অর্ধেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। বাকি অংশও পরে মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করে।

গিফার ও আসলাম গোত্রের জন্য নবীজির দোয়া

গিফার গোত্রের মানুষদের ইসলাম গ্রহণের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি প্রতিবেশী আসলাম গোত্রের লোকজনও ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, দুই গোত্রের এই পরিবর্তনের ঘটনায় নবীজি (সা.) তাঁদের জন্য দোয়া করেছিলেন।

প্রতিবেদনে এ তথ্যের উৎস হিসেবে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম এবং ইবনে হাজর আসকালানির আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে।

গিফার গোত্রের একজন মানুষের সত্যের সন্ধান থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত একটি বৃহৎ সামাজিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। আবু জর (রা.)-এর দৃঢ়তা, সত্য অনুসন্ধান এবং দাওয়াতের মাধ্যমে তাঁর নিজ গোত্রের বহু মানুষ ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হন—যা ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version