ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরকে আর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। দিল্লি পুলিশ সম্প্রতি এ স্থানকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থানের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এর পরিবর্তে প্রতিবাদ ও গণসমাবেশের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে—রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড।
দিল্লি পুলিশের এ সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই স্থান।
জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ থেকে যন্তর মন্তরের যাত্রা
যন্তর মন্তর মূলত জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত হয়েছিল। ১৭২৪ সালে জয়পুরের মহারাজা সওয়াই জয় সিং দ্বিতীয় দিল্লিতে এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারানসি ও মথুরাতেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণকেন্দ্র নির্মিত হয়।
সূর্য, চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ, সময় নির্ধারণ এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার জন্য এখানে বিশেষ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্রাট যন্ত্র, রাম যন্ত্র ও জয়প্রকাশ যন্ত্র এর উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
সময়ের পরিবর্তনে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাকে ঘিরে গড়ে ওঠে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের সংস্কৃতি। দিল্লির কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার কাছে অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিকেরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যন্তর মন্তরকে বেছে নিতেন।
বহু ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাক্ষী
ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে যন্তর মন্তরের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ২০১১ সালে আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সময় এখানে অনশন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবিতে ওই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
এ ছাড়া ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের দাবি, কৃষকদের বিভিন্ন আন্দোলন এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের ‘এক পদ, এক পেনশন’ দাবির কর্মসূচিও এই স্থানকে আলোচনায় এনেছে।
২০২৩ সালে কুস্তিগিরদের প্রতিবাদ কর্মসূচিও যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জায়গাটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং নাগরিকদের দাবি ও ক্ষোভ প্রকাশের পরিচিত মঞ্চে পরিণত হয়।
কেন নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ?
দিল্লি পুলিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যন্তর মন্তরের পরিবর্তে তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর জারি করা পুলিশ কমিশনারের আদেশের পর ১২ অক্টোবর এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসে।
নতুন স্থানগুলো হলো:
- রামলীলা ময়দান: মধ্য দিল্লিতে অবস্থিত।
- বুরারি গ্রাউন্ড: উত্তর দিল্লির একটি নির্ধারিত স্থান।
- সিবিডি গ্রাউন্ড: পূর্ব দিল্লির শাহদারায় অবস্থিত।
নতুন স্থানগুলোতে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য বিস্তারিত নিয়ম ও কার্যপদ্ধতি আলাদাভাবে প্রকাশের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিকল্প স্থানগুলো কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার তুলনায় দূরে হওয়ায় আন্দোলনকারীদের যাতায়াত, জনসমাগম এবং কর্মসূচির দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা
যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রশাসনের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরার সুযোগও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নির্ধারিত স্থান পরিবর্তনের ফলে আন্দোলনকারীদের নতুন জায়গায় কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে। তবে এর ফলে প্রতিবাদের সুযোগ বাস্তবে কতটা সহজ বা কঠিন হবে, তা নির্ভর করবে বিকল্প স্থানগুলোর প্রবেশযোগ্যতা, অনুমতিপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
একসময় মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এখন নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর ঐতিহাসিক এই স্থানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং দিল্লিতে নাগরিক প্রতিবাদের ধরন কোন দিকে যায়, সেদিকে নজর থাকবে।
