ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকনেতারাও আন্দোলন থেকে ফিরে কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সোমবার (২ নভেম্বর) সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করে কাজে যোগ দিতে দেখা যায়। এর আগে শ্রমিকনেতা ও পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।

মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ায় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা কমে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান

সোমবার রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে তাঁদের প্রতিনিধিরা লড়াই চালিয়ে যাবেন। তাই শ্রমিকদের আপাতত কারখানায় ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাবুল আখতার বলেন, ‘আপনারা কারখানায় ফিরে কাজে যোগ দিন। আপনাদের ন্যায্য মজুরির জন্য আমরা লড়াই করব। প্রয়োজনে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের আবারও ডাকব।’

আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সংশোধিত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে অযথা বিলম্বের কোনো কারণ নেই।

নতুন মজুরির প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান তৈরির আগে বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশন, কারখানাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন ও সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে যা বলছেন নেতারা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, চলমান আন্দোলনে শ্রমিকদের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং এতে তাঁদের ন্যায্য দাবিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আখতার বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কারখানার মালিকেরা কাজের আদেশ হারাচ্ছেন। আন্দোলনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল অনুপ্রবেশ করেছে কি না, তা তদন্তের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, পাঁচ বছরের পরিবর্তে প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার বিধান শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শান্তিপূর্ণ আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস, টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি কুতুবউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তাঁদের সংগঠন পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। শ্রমিক, মালিক ও সরকারের আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপনও মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। নতুন মজুরি চূড়ান্ত করতে দ্রুত ও নিয়মিত বৈঠকের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার মতো সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।

ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন

এর আগে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং স্বতন্ত্র সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন।

বোর্ডটি তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য নতুন ন্যূনতম মজুরি সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফেরার প্রবণতা শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসার আশা তৈরি করেছে। এখন নতুন মজুরি কাঠামো কত দ্রুত চূড়ান্ত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন শ্রমিক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: বাসস।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version