যশোর প্রতিনিধি

টানা বর্ষণে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পর তিন মাস ধরে পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন লাখো মানুষ। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো অনেক বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় পানি জমে আছে। অনেকে ঘর ছেড়ে উঁচু সড়কে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের ৫২ বছর বয়সী সুমিত্রা মণ্ডলের বাড়ির উঠান ও ঘরে পানি। পরিবারের সদস্য ও গবাদিপশু নিয়ে তিনি বাড়ির পাশের উঁচু সড়কে টিনের ছাউনি তুলে প্রায় তিন মাস ধরে বসবাস করছেন। তাঁর স্বামী দুইবার স্ট্রোক করে অসুস্থ। পরিবারের আয়ও নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

সুমিত্রা মণ্ডল বলেন, আগে ঘরে প্রায় এক হাত পানি ছিল। এখন কিছুটা কমেছে। তবে উঠানে এখনো হাঁটুপানি। এক পাশে গরু আর অন্য পাশে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতে হচ্ছে।

সুজাতপুর গ্রামের আরেক বাসিন্দা মহানন্দ মণ্ডল জানান, ঘরের ভেতর ও উঠানে পানি থাকায় তিনি বাড়িতে থাকতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন।

নদী-খাল ভরাটে বাড়ছে জলাবদ্ধতা

ভবদহ অঞ্চলের মধ্যে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার পাশাপাশি খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার কিছু নিচু এলাকাও রয়েছে। এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হচ্ছে না।

অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামের শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইচগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অতিবৃষ্টির সময় বিপুল পরিমাণ পানি জমে যাওয়ায় বিল উপচে আশপাশের গ্রাম প্লাবিত হয়।

টানা বৃষ্টির পর অভয়নগরের বালারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, অন্ধ, দিঘলিয়া, বরান্দি, কোটাসহ বিভিন্ন গ্রাম এবং মনিরামপুরের হাতগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লক্ষ্মীদাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙ্গা, পদ্মনাথপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে।

পরে ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইচগেটের সব কটি গেট খুলে দেওয়া এবং ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত হরি ও তেলিগাতি নদী খননের পর কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করে। তবে এখনো অনেক বাড়িঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানির মধ্যে রয়েছে।

৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে কপোতাক্ষ নদীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ছয়টি নদীর মোট ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।

এরই মধ্যে ৫৯ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার নদী খননের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে হরিহর নদীর ৩৫ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং হরি নদীর ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩ কিলোমিটার অংশও পুনঃখননের কাজ চলছে। প্রকল্পটি আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানিয়েছেন, বর্তমানে ভবদহ বিলে পানির উচ্চতা প্রায় তিন ফুট বেড়েছিল। ২১-ভেন্ট সুইচগেটের সব গেট খোলা রয়েছে এবং সেগুলো দিয়ে পানি বের হচ্ছে। ফলে দ্রুত পানি কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টিআরএম চালুর দাবি

ভবদহের জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে সমাধানে নদী পুনঃখননের পাশাপাশি টিআরএম বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (Tidal River Management) চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, এখনই টিআরএম চালু করা প্রয়োজন। তা না হলে নদী পুনঃখননে ব্যয় করা প্রায় ১৪০ কোটি টাকাও কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও দিতে পারে।

দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় ভবদহ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বসতঘর, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে থাকায় দুর্ভোগও দীর্ঘ হচ্ছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version