বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমতে কমতে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর, শুক্রবার পর্যন্ত এক সপ্তাহে স্বর্ণের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
রয়টার্সের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম একপর্যায়ে প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৯৭৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে যায়। ৪ হাজার ডলারের গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করে নিচে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এক সপ্তাহে দাম কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে দাম কমে প্রায় ২৯ শতাংশ নিচে নেমেছে।
স্বর্ণকে সাধারণত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংকট ও শেয়ারবাজারের অস্থিরতার সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে দরপতনের মধ্যেও স্বর্ণের দাম কমেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে লোকসানের কারণে কিছু বিনিয়োগকারী অন্য সম্পদ বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ ও রুপির মতো মূল্যবান ধাতুর ওপরও বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ায় স্বর্ণের বাজারে চাপ
স্বর্ণের দরপতনের অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সৌদি আরবে হুথি হামলার পর জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ বাড়ে। এতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পণ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দীর্ঘদিন বেশি রাখার প্রয়োজন হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুদের হার বেশি থাকলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের তুলনামূলক আকর্ষণ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হলে ডলারে লেনদেন হওয়া স্বর্ণ অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এসব কারণ একসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আরও কতটা কমতে পারে স্বর্ণের দাম?
বাজার বিশ্লেষকদের নজর এখন স্বর্ণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্তরের দিকে। প্রতিবেদনে ব্যাংক অব আমেরিকার কৌশলবিদ পল সিয়ানার বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৯৪৩ ডলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই স্তরের ওপরে দাম স্থিতিশীল থাকলে বাজারে পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দাম এর নিচে নেমে গেলে পরবর্তী সময়ে ৩ হাজার ৮৮৬ ডলার এবং আরও পরে ৩ হাজার ৭০০ ডলারের দিকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এগুলো বাজারভিত্তিক সম্ভাব্য মূল্যস্তর, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। প্রকৃত দাম নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা, ডলারের গতিপথ, সুদের হার এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর।
স্বর্ণের দাম নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস কী বলছে?
স্বল্প মেয়াদে স্বর্ণের বাজারে চাপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস নিয়ে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নেতিবাচক নয়।
ইউবিএসের প্রধান বিনিয়োগ কার্যালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, গোল্ডম্যান স্যাকসও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির সম্ভাবনা দেখছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সুদের হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়লে স্বর্ণের বাজারে আরও দরপতন হতে পারে বলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।
অর্থাৎ, স্বর্ণের দাম এখন কমলেও ভবিষ্যতে আবার বাড়বে কি না, তা নিয়ে বাজারে ভিন্নমত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ফেডের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে বিনিয়োগকারীরা
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠক স্বর্ণের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তখন বাজারের অংশগ্রহণকারীরা আসন্ন বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি দেখছিলেন। তবে ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশাও জোরালো হয়েছিল।
ফেডের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী নীতিগত ইঙ্গিতের ওপর নির্ভর করে মার্কিন ডলার, বন্ডের সুদ এবং স্বর্ণের দামে নতুন করে ওঠানামা দেখা দিতে পারে। তাই স্বর্ণের বাজারে স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য এর অর্থ কী?
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমলেই বাংলাদেশে একই হারে স্বর্ণের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দর ছাড়াও ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ও স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) ঘোষিত মূল্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি আউন্সের দাম এবং বাংলাদেশের বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দামকে আলাদা করে দেখতে হবে। দেশে স্বর্ণ কেনা বা বিক্রির আগে বাজুসের সর্বশেষ মূল্যতালিকা যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, স্বর্ণের বাজারে এখন স্বল্পমেয়াদি চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি আশাবাদের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। তেলের দাম, মার্কিন সুদের হার, ডলারের অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা আগামী দিনে এই বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
