বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। তবে সামনে আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করতে পারে এমন একটি বিষয় হলো—জলবায়ুগত ধাক্কা যখন দেশের বিদ্যমান কৃষি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে একসঙ্গে আঘাত হানে।
২০২৬ সালে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতি এ কারণে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারবাজারেও একই সময়ে অস্থিরতা চলছে।
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাবে বর্ষা দেরিতে আসা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NOAA) পূর্বাভাস অনুযায়ী, অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে এল নিনো খুব শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। এমনকি ১৯৫০ সালের পরের কয়েকটি বড় এল নিনো পর্বের তুলনায় এবার এর তীব্রতা বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কৃষিতে
বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় উদ্বেগ কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটাই আমন ও বোরো ধানের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৩ শতাংশ এসেছে বোরো এবং প্রায় ৪১ শতাংশ আমন থেকে।
কিন্তু বোরো চাষে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয়। ফলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা কিংবা পানির প্রাপ্যতায় বড় পরিবর্তন এলে কৃষি উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি বড় অংশও কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কৃষিতে উৎপাদন কমে গেলে শুধু খাদ্যের সরবরাহ নয়, গ্রামীণ আয় ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
কৃষি উৎপাদন কমে গেলে বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে বড় উৎপাদনকারী দেশগুলোও আবহাওয়াজনিত সমস্যায় পড়লে আমদানির খরচও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ দেশের নিজস্ব উৎপাদন খুব বেশি না কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের ভোক্তাদের বেশি দামে খাদ্য কিনতে হতে পারে।
এর আগে ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক বছরে আরও কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে।
সার আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
কৃষিতে আরেকটি বড় সমস্যা সার। বাংলাদেশ তার মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সার সরবরাহ কিংবা দামের বড় পরিবর্তন হলে দেশের কৃষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে আন্তর্জাতিক সারের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি কেউ কেউ সারের ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারেন। তাতে ফলনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কৃষিখাতকে সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে ৬ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানিতে জরুরি অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর ধান উৎপাদনে সহায়তা করার কথা।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করতে পারে
কৃষি শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নয়। সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদ, পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে জ্বালানি প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্য পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও বাড়বে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এ ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ২৮১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হয়েছে, যা মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৩১ শতাংশ। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট গ্যাস ব্যবহারের ৪১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু ও জ্বালানি সংকট একসঙ্গে এলে ঝুঁকি বাড়বে
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, কৃষিতে জলবায়ুগত ধাক্কা এবং জ্বালানি সংকট যদি একই সময়ে ঘটে।
একদিকে উৎপাদন কমবে, অন্যদিকে সেচ, সার, পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বাড়বে। এর ফলে কম উৎপাদন, বেশি খরচ এবং খাদ্যের উচ্চমূল্য—এই তিনটি সমস্যা একে অপরকে আরও তীব্র করতে পারে।
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় এমন পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র, গ্রামীণ ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
তবে এসব হিসাব এল নিনোর সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির পূর্বাভাস নয়; বরং বাংলাদেশের বিদ্যমান দুর্বলতা কতটা গভীর, তার একটি চিত্র তুলে ধরে।
এখনই প্রস্তুতি প্রয়োজন
এল নিনোকে শুধু সাময়িক আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। দেশের কৃষি, খাদ্যবাজার ও জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।
কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল ধানের জাত, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, দক্ষ সেচ এবং আরও নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাসে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—খাদ্যনিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে একই নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।
বাংলাদেশের জন্য এল নিনো তাই শুধু বৃষ্টি বা তাপমাত্রার পূর্বাভাসের বিষয় নয়। এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে একসঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি স্পষ্ট হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
