ফিলিস্তিনের পাঠ্যবই থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দ বাদ দিয়ে ইহুদিদের ব্যবহৃত ‘সামারিয়া’ নাম যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার—এমন দাবি করেছেন জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক। অথচ বর্তমানে গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে গঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ব্লেয়ার।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্টক বলেন, গাজা যুদ্ধের অবসান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত—তা দেখাতে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।
গ্রিনস্টকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ উদ্দেশ্যে ব্লেয়ারকে রামাল্লাহ পাঠানো হয়েছিল। তবে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এমন প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে দাবি করেন গ্রিনস্টক।
ব্লেয়ারের মুখপাত্রের অস্বীকার
গ্রিনস্টকের এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন টনি ব্লেয়ারের একজন মুখপাত্র। তিনি দাবি করেছেন, এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি এবং গ্রিনস্টকের বক্তব্য ‘সম্পূর্ণ অসত্য ও বানোয়াট’।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টের মাঝামাঝি ব্লেয়ার ইসরায়েল সফর করেন। এ সময় ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং গাজাবিষয়ক মার্কিন প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ইসরায়েলে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে প্রতিনিধি দলটি কায়রো সফর করে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি দল এবং হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।
ব্লেয়ারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
ইরাক যুদ্ধের সময় টনি ব্লেয়ারের ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন গ্রিনস্টক। তাঁর মতে, ইরাক যুদ্ধ এবং ক্ষমতা ছাড়ার পর ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্লেয়ারের অবস্থানের কারণে তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন আলোচনায় নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়তে পারেন।
গ্রিনস্টক ‘বোর্ড অব পিস’-কেও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও অস্থির প্রকৃতির একটি উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রয়োজনীয় কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মতো প্রভাব এ পরিষদের নেই।
‘ফিলিস্তিন’ নাম মুছে ফেলার অভিযোগ
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় ইতিহাস ও শিক্ষাক্রম থেকে ‘ফিলিস্তিন’ নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সরকারি স্কুলগুলোতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ও নিজস্ব পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। লেবাননে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কিছু শিক্ষাসামগ্রী নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। কিছু মানচিত্রে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দের পরিবর্তে ‘পশ্চিম তীর’ ও ‘গাজা উপত্যকা’ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একটি প্রদর্শনী থেকেও ‘ফিলিস্তিন’ ও ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দ সরানোর অভিযোগ নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে গ্রিনস্টকের মন্তব্য
গ্রিনস্টক ব্রিটেনের ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথাও বলেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক সমাধান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।
গ্রিনস্টকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত সামরিক নির্ভরতা এবং মিত্রদেশগুলোর স্বার্থের চেয়ে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
