পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণায় নতুন প্রশ্ন উঠেছে। একসময় মনে করা হতো, কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে আসা ধূমকেতু পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান সরবরাহ করেছিল। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমকেতুর আঘাতে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে এসব উপাদানের অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিজ্ঞান সাময়িকী Scientific Reports-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৌঁছানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত কম ছিল।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড অ্যানসলোর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকেরা ধূমকেতুর সৃষ্টি, বিবর্তন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ এবং আঘাতের সময় জৈব অণুর টিকে থাকার বিষয়গুলো নিয়ে আধুনিক কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন। এ জন্য প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ বিবেচনায় ১ লাখ বার সিমুলেশন পরিচালনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ সিমুলেশনে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ঘনত্বে হাইড্রোজেন সায়ানাইড সরবরাহ করতে সক্ষম কোনো সফল ধূমকেতুর আঘাত পাওয়া যায়নি। বাকি ৪৬ শতাংশ সিমুলেশনে অন্তত একটি সফল আঘাতের সম্ভাবনা দেখা গেছে। খুব অল্পসংখ্যক সিমুলেশনে সর্বোচ্চ তিনটি সফল আঘাতের ঘটনা পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, ধূমকেতুগুলো পৃথিবীতে যে গতিতে আঘাত হানত, তাতে সেগুলোর বহন করা গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানোর সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।

প্রাণ সৃষ্টির উপাদান নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাইড্রোজেন সায়ানাইড বা এইচসিএন নামের রাসায়নিক যৌগকে। হাইড্রোজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত এই যৌগ প্রাণের উৎপত্তির প্রাথমিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

হ্যালি ও হেল-বপসহ সৌরজগতের বিভিন্ন ধূমকেতুতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই যৌগ থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যামিনো অ্যাসিডসহ প্রাণ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ জৈব উপাদানের পূর্বসূরি তৈরি হতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান।

কিন্তু ধূমকেতু যখন প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তখন সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড তাপ ও চাপ। এতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক যৌগ ভেঙে যেতে পারে।

আবার কোনোভাবে এসব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছালেও প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ঘনত্ব বজায় রাখা কঠিন। বিশেষ করে সমুদ্র বা জলাধারে ধূমকেতুর আঘাত হলে রাসায়নিক উপাদান দ্রুত পানিতে মিশে পাতলা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষকদের মতে, প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য ফসফরাস ও সালফারযুক্ত যৌগসহ আরও অনেক উপাদান প্রয়োজন। কিন্তু ধূমকেতুতে এসব উপাদান নিয়মিত পাওয়া যায় না। ফলে একটি ধূমকেতু প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান নিয়ে এলেও একই স্থানে অন্য উপাদানগুলো পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

বিকল্প উৎস হতে পারে গ্রহাণু ও প্রাচীন পৃথিবী

ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে আসার তত্ত্ব দুর্বল হয়ে পড়লেও বিজ্ঞানীরা বিকল্প সম্ভাবনা দেখছেন।

এর একটি হলো, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশেই প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় জৈব অণু তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ প্রাণের উৎপত্তির উপাদান পৃথিবীর বাইরের কোনো উৎস থেকে আসতেই হবে, এমন নয়।

আরেকটি সম্ভাব্য উৎস হলো গ্রহাণু। ধূমকেতুর তুলনায় অনেক গ্রহাণু পৃথিবীতে কম গতিতে আঘাত হানতে পারে। ফলে সেগুলোর বহন করা কিছু জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।

এর আগে গ্রহাণু বেন্নু ও রিউগু থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় বিভিন্ন ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড ও জৈব যৌগের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এসব আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে মহাকাশ থেকে আসা উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

মঙ্গলে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি?

নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর তুলনায় প্রাচীন মঙ্গলে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর পরিবেশ তুলনামূলক অনুকূল হতে পারে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মঙ্গল পৃথিবীর তুলনায় ছোট এবং এর বায়ুমণ্ডল অনেক পাতলা। ফলে প্রাচীনকালে সেখানে আঘাত হানা ধূমকেতুর কিছু অংশ পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ বেশি থাকতে পারে।

পৃথিবীতে যে আঘাতে গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, মঙ্গলে একই ধরনের ধূমকেতুর কিছু উপাদান টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এই ধারণা মঙ্গলে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে গবেষণাটি মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ দেয়নি।

ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা

নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলেও প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি বাতিল করতে রাজি নন অন্য বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যানের মতে, ধূমকেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই হাইড্রোজেন সায়ানাইড বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এর ফলে অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো তুলনামূলক স্থিতিশীল জৈব যৌগ তৈরি হতে পারে, যা সংঘর্ষের পরও টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিকোল জেলনারও ধূমকেতুর সম্ভাব্য ভূমিকা পুরোপুরি নাকচ করতে চান না।

গবেষকেরা বলছেন, ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছানো অত্যন্ত বিরল ঘটনা হতে পারে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির রহস্য এখনো অমীমাংসিত। নতুন গবেষণা সেই রহস্যের উত্তর খোঁজার পথে ধূমকেতুর ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version