নোবেল পুরস্কারের দীর্ঘ ইতিহাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। তবে বিজ্ঞান ও গবেষণায় ক্যুরি পরিবার এমন এক অনন্য নজির তৈরি করেছে, যা নোবেল ইতিহাসে আজও বিশেষভাবে আলোচিত।

মারি ক্যুরি ও পিয়েরে ক্যুরি দম্পতি, তাঁদের মেয়ে আইরিন জোলিও-ক্যুরি এবং জামাতা ফ্রেডেরিক জোলিও—সব মিলিয়ে ক্যুরি পরিবারের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের যোগসূত্র অভাবনীয়। নোবেল পুরস্কারের নিজস্ব তথ্যভান্ডারও ক্যুরি পরিবারকে সবচেয়ে সফল ‘নোবেল পরিবার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মারি ও পিয়েরে ক্যুরি: শুরুটা যেভাবে

১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে যৌথ গবেষণার জন্য মারি ক্যুরি ও পিয়েরে ক্যুরি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। একই পুরস্কারের অর্ধেকের আরেক অংশ পেয়েছিলেন হেনরি বেকেরেল।

এই পুরস্কারের মাধ্যমে মারি ক্যুরি ইতিহাসের প্রথম নারী নোবেলজয়ী হন। তাঁদের গবেষণা পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয়তা, পরমাণুবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।

মারি ও পিয়েরে ক্যুরি শুধু জীবনসঙ্গীই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন গবেষণারও সহযাত্রী। রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামসহ তেজস্ক্রিয় উপাদান নিয়ে তাঁদের গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

একাই দুটি নোবেল জেতেন মারি ক্যুরি

১৯০৬ সালে পিয়েরে ক্যুরির মৃত্যুর পরও থেমে থাকেননি মারি। নিজের গবেষণা অব্যাহত রেখে ১৯১১ সালে তিনি রসায়নে দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

এর ফলে মারি ক্যুরি একই সঙ্গে দুই ভিন্ন বিজ্ঞান শাখায় নোবেল পাওয়া প্রথম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। পদার্থবিজ্ঞানে ১৯০৩ এবং রসায়নে ১৯১১—দুই পুরস্কারই তাঁর অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতি।

নোবেল পুরস্কারের তথ্য অনুযায়ী, মারি ক্যুরি এখন পর্যন্ত দুইবার নোবেল পাওয়া একমাত্র নারী।

বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করেন আইরিন

মারি ও পিয়েরে ক্যুরির বড় মেয়ে আইরিন জোলিও-ক্যুরিও পরবর্তীতে বিজ্ঞানের জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন।

১৯৩৫ সালে স্বামী ফ্রেডেরিক জোলিওর সঙ্গে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান আইরিন। কৃত্রিমভাবে নতুন তেজস্ক্রিয় উপাদান তৈরির কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

অর্থাৎ একই পরিবারে এক প্রজন্মের মা-বাবার পর পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েও নোবেলজয়ী হয়েছেন—বিজ্ঞানের ইতিহাসে যা অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

আইরিন ও ফ্রেডেরিকের যৌথ সাফল্য

আইরিন জোলিও-ক্যুরি ও ফ্রেডেরিক জোলিও তাঁদের গবেষণায় কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা তৈরির পথ দেখান। তাঁরা আলফা কণা দিয়ে অ্যালুমিনিয়ামকে বোম্বার্ড করে এমন একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি করেন, যা আগে প্রকৃতিতে বিদ্যমান ছিল না।

এই আবিষ্কার পরবর্তীতে পারমাণবিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে গবেষণার নতুন দরজা খুলে দেয়।

ক্যুরি পরিবারের সঙ্গে আরেক নোবেল-সংযোগ

মারি ক্যুরির ছোট মেয়ে এভ ক্যুরি নিজে নোবেলজয়ী ছিলেন না। তবে তাঁর স্বামী হেনরি আর. ল্যাবুইজ ১৯৬৫ সালে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে সংস্থাটির পক্ষে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। ফলে ক্যুরি পরিবারের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়।

তবে এ পুরস্কারটি ল্যাবুইজের ব্যক্তিগত নামে নয়, ইউনিসেফের নামে দেওয়া হয়েছিল—এটি আলাদা করে উল্লেখযোগ্য।

অন্য নোবেলজয়ী দম্পতিরাও আছেন

ক্যুরি পরিবার ছাড়াও নোবেল ইতিহাসে কয়েকটি স্বামী-স্ত্রী জুটি যৌথভাবে এই পুরস্কার পেয়েছেন।

গার্টি কোরি ও কার্ল কোরি ১৯৪৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পান। ২০১৪ সালে নরওয়ের মে-ব্রিট মোজার ও এডভার্ড মোজারও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল অর্জন করেন। আবার ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পান অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এস্থার দুফলো।

তবে ক্যুরি পরিবারের বৈশিষ্ট্য আলাদা। একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা নোবেলজয়ী হয়েছেন এবং পরিবারটির নাম একাধিক নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনও ক্যুরি পরিবারকে সবচেয়ে সফল নোবেল পরিবার হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কেন আজও এত আলোচিত ক্যুরি পরিবার?

ক্যুরি পরিবারের বিশেষত্ব শুধু নোবেলজয়ীর সংখ্যায় নয়। তাঁদের গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

মারি ও পিয়েরে ক্যুরির তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা থেকে শুরু করে আইরিন ও ফ্রেডেরিকের কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার—প্রতিটি ধাপই বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তাই নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ক্যুরি পরিবার শুধু একটি সফল পরিবার নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, গবেষণা ও আবিষ্কারের এক অনন্য উদাহরণ।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version