ইসলাম ডেস্ক

ইসলামের ইতিহাসে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বহু উদাহরণ রয়েছে। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো সাহাবিদের নানা ক্ষেত্রে দায়িত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব এক ছিল না, তবে প্রত্যেকের বিশেষ গুণ চিহ্নিত করে তা বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশে রাসুল (সা.)-এর পদ্ধতিতে উপদেশের পাশাপাশি দায়িত্ব দেওয়া, ভুল সংশোধন, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।

১. ভালোবাসা দিয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া

কাউকে সংশোধন করার আগে তার আস্থা অর্জন করা জরুরি—তরুণদের সঙ্গে মহানবী (সা.) এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। এক যুবক তাঁর কাছে ব্যভিচারের অনুমতি চাইলে তিনি তাকে ধমক না দিয়ে কাছে ডাকেন এবং মা, মেয়ে, বোন, ফুফু ও খালার প্রসঙ্গ তুলে তাকে বিষয়টি বোঝান। পরে ওই যুবকের জন্য দোয়া করেন। বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে ঘৃণিত আর কিছু ছিল না। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)

২. তরুণের প্রতিভা চিনে বিকশিত করা

সব তরুণের যোগ্যতা এক নয়। কেউ জ্ঞান, কেউ নেতৃত্ব, কেউ ভাষা বা লেখালেখিতে দক্ষ হতে পারে। মহানবী (সা.) ব্যক্তিভেদে এসব সক্ষমতা চিহ্নিত করে তাদের উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতেন।

জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর শেখার ক্ষমতা দেখে তাঁকে ইহুদিদের ভাষা শেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি নবীজির চিঠিপত্র পড়া ও লেখার কাজ করেন এবং পরবর্তীকালে ওহি লেখকদের একজন ও কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন।

একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য নবীজি দোয়া করেছিলেন, যাতে তিনি ধর্মের গভীর জ্ঞান ও কোরআনের ব্যাখ্যা লাভ করেন। পরে তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

৩. আত্মবিশ্বাস তৈরি করা

তরুণদের ভালো গুণের প্রশংসার মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোও ছিল নবীজির শিক্ষাপদ্ধতির অংশ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ এরপর ইবনে ওমর (রা.) রাতের নামাজের প্রতি আরও যত্নবান হন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১২২)

৪. যোগ্যতা অনুযায়ী বাস্তব দায়িত্ব দেওয়া

মহানবী (সা.) তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেননি; যোগ্যতা দেখলে বর্তমানেই দায়িত্ব দিয়েছেন। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)। তরুণ বয়সেই তিনি একটি বাহিনীর নেতৃত্ব পান, যেখানে তাঁর চেয়ে বয়সে বড় সাহাবিরাও ছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি উঠলে নবীজি তাঁর যোগ্যতার পক্ষে কথা বলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০)

৫. জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া

শুধু শিক্ষা নয়, সেই শিক্ষা কাজে লাগানোর সুযোগও তরুণদের দেওয়া হয়েছিল। মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় পাঠানো হয়েছিল ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছে দিতে। সেখানে তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন।

৬. ইমান ও চিন্তার ভিত শক্ত করা

দায়িত্ব দেওয়ার আগে তরুণদের চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত শক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন নবীজি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তখন কিশোর। এক সফরে তাঁকে নবীজি আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, দোয়া এবং তাকদির সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)

৭. শিষ্য নয়, শিক্ষক হিসেবে তৈরি করা

তরুণদের শুধু নিজের কাছে শিখিয়ে রেখে না দিয়ে অন্যদের শেখানোর দায়িত্বও দেওয়া হতো। কয়েকজন তরুণ প্রায় ২০ দিন নবীজির কাছে থাকার পর পরিবারে ফিরে যেতে চাইলে তিনি তাঁদের ফিরে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা দেওয়া ও সৎকাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৪৬)

এভাবে নবীজির শিক্ষাপদ্ধতিতে তরুণদের শুধু অনুসারী নয়, ভবিষ্যতের শিক্ষক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version