এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে।
এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনশীল, বিনিয়োগনির্ভর ও দুর্যোগসহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি কাজ অব্যাহত রাখবে। এর মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইংমিং ইয়াং এসব কথা বলেন। তিনি ৯ থেকে ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এডিবির নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (CPS), গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (IGND) উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
ইংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সহায়তা করাই এডিবির অন্যতম লক্ষ্য।
তার মতে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, সেবা খাতের ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং প্রাণবন্ত বেসরকারি খাতের কারণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। এখন এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে আরও গভীর রূপান্তর আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার প্রত্যাশা
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে, মূল্যস্ফীতি কমলে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব
ইংমিং ইয়াং সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন উন্নত করা, খেলাপি ঋণ মোকাবিলা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
তার মতে, এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি হবে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের পরামর্শ
বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নারী ও তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বেসরকারি খাত হবে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালিকা
ইংমিং ইয়াংয়ের মতে, পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এবং বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা।
এর ফলে বেসরকারি পুঁজি উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এর সুফল হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ আরও ভালো কর্মসংস্থান, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প, উন্নত সেবা এবং প্রচলিত অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর বাইরেও নতুন সুযোগ পাবে।
নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজিতে গুরুত্ব পাবে বৈচিত্র্য
বাংলাদেশের জন্য নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে ইংমিং ইয়াং বলেন, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এডিবির অংশীদারত্বও পরিবর্তিত হয়েছে।
নতুন কৌশলের লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে আরও বৈচিত্র্যময়, প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়া।
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় IGND উদ্যোগ
ইংমিং ইয়াং বলেন, ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট বা IGND উদ্যোগ পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।
এর মাধ্যমে বড় শহরের বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যবসা ও শ্রমবাজারকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
ফলে উচ্চমানের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় ও দ্রুতবর্ধনশীল বাজারগুলোর মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশেষ কৌশলগত সুবিধা ভোগ করছে বলে মনে করেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট।
এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা গত মে মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় পরিবহন, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠার বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন।
ইংমিং ইয়াং বলেন, কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ পাবে।
শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশের আঞ্চলিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ইংমিং ইয়াং।
তার মতে, সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত অবকাঠামো ও জ্বালানি সংযোগের পাশাপাশি কার্যকর কাস্টমস ব্যবস্থা, সমন্বিত মানদণ্ড, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নির্বিঘ্ন সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থাৎ, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নীতিগত সমন্বয়ও একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় জ্বালানি সংযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল সংযোগ ও এআই দক্ষতা উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ
এডিবির সম্প্রতি চালু করা ২০ বিলিয়ন ডলারের এশিয়া-প্যাসিফিক ডিজিটাল হাইওয়ে উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন ইংমিং ইয়াং।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ডিজিটাল সংযোগ বাড়ানো, নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
এর মাধ্যমে কৃষক, উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক, তরুণ কর্মী ও নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন আরও কার্যকরভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে।
অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প নয় আঞ্চলিক সংযোগ
ইংমিং ইয়াং মনে করেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ কখনোই অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প হতে পারে না। বরং এসব উদ্যোগ সংস্কারকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সুযোগগুলো আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও সংস্কারের জন্য আরও শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি করবে।
বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধিই ভবিষ্যতের মূল চালিকা
ইংমিং ইয়াংয়ের মতে, এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ আরও সংযুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং সুযোগসমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারবে।
আগামী উন্নয়ন পর্যায়ে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি হবে বলে মনে করেন তিনি।
