আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১১ দলীয় ঐক্যে থাকলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের বাইরে গিয়ে পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দল দুটি। তবে নির্বাচনে আলাদা অবস্থান নিলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য অটুট রাখার কথা বলছেন দুই দলের নেতারা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াত ও এনসিপি। দুই দলই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করছে এবং নির্বাচনি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে এনসিপিও বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য জোটগতভাবে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে।
এরই মধ্যে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জোটের সাম্প্রতিক লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি এ আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে দুই দলের নেতারা এ ধরনের গুঞ্জন নাকচ করেছেন। তাঁদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলের অংশ। এতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যে কোনো প্রভাব পড়বে না।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো ধরনের ফাটল বা দূরত্বের গুঞ্জন ভিত্তিহীন। জুলাই বিপ্লবের চেতনা, ফ্যাসিবাদের বিলোপ, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই পক্ষের ঐক্য অটুট রয়েছে।
তিনি বলেন, দল হিসেবে এনসিপির নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে জনগণের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে চায় দলটি। তাই এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতিকে জোট ভাঙনের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও দুই দলের মধ্যে দূরত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নাহিদ ইসলাম অংশ নিতে না পারলেই জোটের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে দুই দল একসঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি আলাদাভাবে অংশ নিলেও এতে জোটের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্বাচনি সমঝোতার সুযোগও রয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক মহলের মতে, এনসিপি সম্প্রতি দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। জোটের বাইরে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরতে সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনি প্রস্তুতিও বাড়াচ্ছে দলটি।
অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের কয়েকজন নেতার মতে, জোটের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের কারণে শরিকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী বাছাইয়ে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষ থেকে উত্তরে মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করা হয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, দলের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে সব মতামতকে সম্মান জানানো হয়। নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জোটের ভাঙন হিসেবে দেখছেন না দলগুলোর নেতারা। তবে প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনি সমঝোতা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়গুলোতে দুই দলের অবস্থান আগামী দিনে ১১ দলীয় ঐক্যের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে দুই দলের পৃথক প্রস্তুতির পাশাপাশি ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।

