অর্থনীতি ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় সামান্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে এই সুবিধা খুব বড় না হওয়ায় এবং দেশের চলমান জ্বালানি সংকট উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলায় এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

গত ২৪ জুলাই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে মার্কিন প্রশাসন। এর ফলে বাংলাদেশি পোশাকের কার্যকর শুল্কহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের পোশাক রপ্তানিতে কার্যকর শুল্কহার ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে হিসাবের দিক থেকে বাংলাদেশ চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কার্যকর শুল্কহার বলতে কোনো পণ্যের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের মার্কিন আমদানি শুল্ক ও অতিরিক্ত সারচার্জ হিসাব করার পর মোট যে হার দাঁড়ায়, তাকে বোঝায়।

তথ্য অনুযায়ী, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও বাংলাদেশের মতো ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ কার্যকর শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব তথ্য ‘Tariffs Tool’-এর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (RAPID) তা যাচাই করেছে।

শুল্ক সুবিধা কতটা কাজে আসবে?

চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় কম শুল্ক বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে ব্যবধান খুব বেশি না হওয়ায় বড় ধরনের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।

হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেন, কম কার্যকর শুল্কহার বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে দেশের জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতা শুল্কহারের চেয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে শুল্ক সুবিধার পুরোটা কাজে লাগানো কঠিন হবে।

RAPID-এর চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকও মনে করেন, বাংলাদেশ ও চীন-ভিয়েতনামের মধ্যে শুল্কের ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে শুধু এই সুবিধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শুল্কনীতি এখনও পরিবর্তনশীল। নতুন শুল্ক আরোপের কারণে শেষ পর্যন্ত মার্কিন ক্রেতারা পোশাকের দাম কমানোর চাপ দিতে পারেন অথবা অতিরিক্ত শুল্কের একটি অংশ রপ্তানিকারকদের বহনের জন্য বলতে পারেন।

চীনের বিকল্প রুট, বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা

এম এ রাজ্জাক আরও বলেন, চীন ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর মতো ‘কানেক্টর’ গন্তব্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে। বাংলাদেশ এখনো এ ধরনের বিকল্প উৎপাদন ও সরবরাহ কাঠামো তৈরি করতে পারেনি।

তবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান শুল্ক সুবিধার বিষয়ে আশাবাদী। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের চালান কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও শুধু কম শুল্কের কারণে রপ্তানি খুব বেশি বাড়বে—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

তিনিও দেশের জ্বালানি সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ রপ্তানি ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ক্রেতারা শুধু শুল্কহার বিবেচনা করেন না; বরং পোশাকের মোট ‘landed cost’ বা গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত মোট ব্যয় হিসাব করেন।

তাই শুল্কে সুবিধা থাকলেও উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য ব্যয় বেশি হলে সেই সুবিধা প্রতিযোগিতায় খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।

তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা, বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো এবং অন্যান্য খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে নন-কটন পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পোশাক খাতে দেশের তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন রেকর্ডকেও কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় কিছুটা কম শুল্কের সুবিধা পেলেও, সেই সুবিধাকে বাস্তব প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে রূপ দিতে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version