ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের পেচেনিহি এলাকায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও আটজন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে চালানো এই হামলায় বেশ কয়েকটি বেসামরিক বাড়িঘর, একটি ক্যাফে, পোস্ট অফিস, দোকান এবং কয়েকটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হতাহতের সংখ্যা প্রাথমিক এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
খারকিভ আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান ওলেহ সিনিয়েহুবভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, পেচেনিহিতে রুশ বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাথমিকভাবে ১০ জন নিহত হয়েছেন। আরও আটজন আহত হয়েছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামলার পর জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করেন।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর
হামলায় অন্তত ১০টি ব্যক্তিগত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আঞ্চলিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি একটি ক্যাফে, পোস্ট অফিস, একটি দোকান এবং অন্তত সাতটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর স্থানীয় এলাকায় ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তৈরি হয় এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলোতে কাজ শুরু করেন।
পেচেনিহি খারকিভ অঞ্চলের একটি বসতি, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার নিরাপত্তাজনিত চাপের মধ্যে রয়েছে। খারকিভ অঞ্চলটি রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই গোলাবর্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ড্রোন আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে
আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান জানিয়েছেন, হামলায় আহত আটজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। স্থানীয় জরুরি সেবা ও চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ হতাহতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত করেনি। হামলার পর ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তল্লাশি চালানো হয়েছে কি না, সে বিষয়েও আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে প্রাথমিক সংখ্যার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে হতাহতের হিসাব পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
পেচেনিহিতে হামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক বাড়ির পাশাপাশি দোকান, ক্যাফে ও পোস্ট অফিসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়িও হামলার শিকার হয়েছে। এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে সরাসরি ব্যাহত করে এবং স্থানীয় ব্যবসা ও প্রয়োজনীয় সেবা কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলে।
যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছেন। বেসামরিক এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে নতুন হামলা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের এমন এক সময়ে পেচেনিহিতে হামলাটি হলো, যখন দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ডে আক্রমণ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি রাশিয়ার ভেতরেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
১৬ আগস্ট রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের ক্রিভি রিহ এলাকায় একটি বড় ইস্পাত কারখানায়ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। ওই হামলায় দুইজন নিহত এবং ১৪ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এর পাল্টা হিসেবে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনায় বড় আকারের ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
খারকিভ অঞ্চল কেন গুরুত্বপূর্ণ
খারকিভ ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এবং রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। ২০২২ সালে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই অঞ্চলটি তীব্র যুদ্ধ ও হামলার মুখোমুখি হয়েছে। সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সামরিক হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
খারকিভ শহরসহ পুরো অঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সতর্কবার্তা, আশ্রয় নেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধের প্রভাব শুধু প্রাণহানি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাহীনতা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
হামলার পর চলছে উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম
পেচেনিহিতে হামলার পর জরুরি সেবার সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও যানবাহনের অবস্থা মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরও কোনো হতাহত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা এটিকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট হামলা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও তথ্যের প্রয়োজন।
যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেও হামলা
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ বা উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
পেচেনিহিতে সর্বশেষ হামলার ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু এবং আটজন আহত হওয়ার তথ্য আবারও দেখিয়ে দিল, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আহতদের চিকিৎসা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কর্তৃপক্ষের বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০ ও আহত ৮ জনের সংখ্যা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে হামলার পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।

