‘যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন’—এ কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এতদিন বিষয়টি মূলত মানসিক শান্তি বা ইতিবাচক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হলেও নতুন এক গবেষণা বলছে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি: কৃতজ্ঞ মানুষ যে নিশ্চিতভাবেই বেশি দিন বাঁচেন, গবেষণাটি এমন প্রমাণ দেয়নি। বরং বেশি কৃতজ্ঞ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যকর আচরণ করার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

কী বলছে নতুন গবেষণা?

২০২৬ সালে British Journal of Health Psychology-এ প্রকাশিত গবেষণায় ২৪টি পৃথক নমুনার মোট ৬ হাজার ৯৬৭ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরাও ছিলেন।

গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাঁদের মধ্যে কৃতজ্ঞতার প্রবণতা বেশি, তাঁদের মধ্যে স্বাস্থ্য উন্নত করে এমন বিভিন্ন আচরণ করার প্রবণতাও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ।

গবেষণায় কৃতজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যকর আচরণের মধ্যে গড়ে ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সম্পর্ক কেন?

গবেষকদের ধারণা, কৃতজ্ঞতা মানুষের মনোযোগকে ‘কী নেই’ থেকে ‘কী আছে’—সেদিকে ফিরিয়ে দিতে পারে। এতে ইতিবাচক অনুভূতি বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

ফলে একজন মানুষ নিজের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তুলনামূলক সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন—অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে ভালো খাবার বেছে নেওয়া, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, সময়মতো ঘুমানো কিংবা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া।

গবেষণায় ইতিবাচক অনুভূতি, নেতিবাচক অনুভূতি এবং ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাকে কৃতজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যকর আচরণের সম্পর্কের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শুধু কৃতজ্ঞ হলেই কি সুস্থ থাকা যায়?

না। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি এখানেই।

গবেষণাটি মূলত কৃতজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যকর আচরণের মধ্যে সম্পর্ক দেখেছে। অর্থাৎ বেশি কৃতজ্ঞ মানুষ বেশি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস পালন করেন—এমন একটি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু শুধু কৃতজ্ঞ থাকার কারণে কেউ স্বাস্থ্যবান হয়ে যাবেন বা বেশি দিন বাঁচবেন—এমন কারণ-ফল সম্পর্ক গবেষণাটি প্রমাণ করেনি।

তাই কৃতজ্ঞতাকে কোনো রোগের চিকিৎসা কিংবা দীর্ঘায়ুর নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

কৃতজ্ঞতা কি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও সহায়ক?

গবেষণায় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ইতিবাচক অনুভূতির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ইতিবাচক অনুভূতি ও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তা কৃতজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যকর আচরণের যোগসূত্রের একটি অংশ ব্যাখ্যা করতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

অর্থাৎ জীবনের ভালো দিকগুলো নিয়ে সচেতন থাকা, নিজের কাছে যা আছে তার মূল্য বোঝা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবা—এসব মানসিক অভ্যাস স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করতে পারে।

কৃতজ্ঞতার চর্চা করবেন কীভাবে?

কৃতজ্ঞতা চর্চার জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন দিনের শেষে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে তিনটি বিষয় লিখে রাখতে পারেন, যেগুলোর জন্য আপনি কৃতজ্ঞ।

তা হতে পারে পরিবারের কারও ভালোবাসা, সুস্থ শরীর, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কাজের একটি ছোট সাফল্য, সুন্দর সকাল কিংবা কোনো কঠিন সময়ে পাওয়া সহায়তা।

গবেষণার আলোচনায়ও কৃতজ্ঞতার চর্চাকে স্বাস্থ্যকর আচরণে উৎসাহ দেওয়ার একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তাহলে কি কৃতজ্ঞ মানুষ বেশি দিন বাঁচেন?

এখনই নিশ্চিতভাবে এমনটা বলা যাবে না।

তবে নতুন গবেষণার বার্তা আশাব্যঞ্জক—কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। আর নিয়মিত শরীরচর্চা, ভালো ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এসবই সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কৃতজ্ঞতা হয়তো সরাসরি ‘দীর্ঘায়ুর ওষুধ’ নয়। কিন্তু নিজের জীবনকে মূল্য দেওয়া এবং সেই জীবনকে আরও স্বাস্থ্যকরভাবে পরিচালনার একটি মানসিক অভ্যাস হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version