কুমিল্লায় পুরোনো কয়েকটি কিশোর গ্যাং এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তথ্য থেকে উঠে এসেছে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে কিশোরদের যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সচ্ছল পরিবারের সন্তানদেরও জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
প্রথম আলোর পর্যালোচনায় ২০২৩ সালের ৭ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিশোর গ্যাং ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের ৩২টি ঘটনা ও অভিযান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার বা আটকের সংখ্যা ৮৮১ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো কিছু গোষ্ঠীর নাম বিভিন্ন সংঘর্ষ ও অপরাধসংক্রান্ত ঘটনায় বারবার এসেছে।
পুরোনো সদস্যদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ
কুমিল্লায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লায় ফেরার পথে তাঁকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার পর চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরদিন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, তাদের একজন আগে কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হওয়ার পর আবার অপরাধে জড়ান।
অভিযানের মধ্যেও থামছে না তৎপরতা
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আটক ব্যক্তিদের অতীত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও ছিল। যাচাই শেষে ৪৫১ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয় এবং অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ ছাড়া দাউদকান্দি থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া কিছু কিশোরের বিরুদ্ধে থানার ভেতরে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্যাংয়ের উপস্থিতি
কুমিল্লায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও, বিশেষ করে টিকটকভিত্তিক কনটেন্টের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের পরিচিতি ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জেলায় অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি সাম্প্রতিক ভিডিওতে ‘রাতন গ্রুপ’-এর প্রধান হিসেবে পরিচিত ইমরান হোসেন ওরফে রাতনকে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির সামনে দেখা যাওয়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ছাত্রদল নেতারা ওই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।
অপরাধের সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংকে ঘিরে সংঘর্ষ, ছিনতাই, মাদক ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কারও অপরাধমূলক দায় আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিশোরদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবক ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
