ইসরাইলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়ছে। দেশটির আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মনোভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইহুদি তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ নিজেদের ডানপন্থি বা মধ্য-ডানপন্থি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
আল জাজিরার ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরাইলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নেসেট নির্বাচনে পাঁচ লাখেরও বেশি নতুন ভোটার অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। জরিপ অনুযায়ী, নতুন ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ফলে নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমবারের ভোটারদের বড় অংশ ডানপন্থি
ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ইহুদি তরুণদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিজেদের ডানপন্থি অথবা মধ্য-ডানপন্থি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। দেশটির সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিল থাকলেও তরুণদের মধ্যে এই ঝোঁক বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর ইসরাইলি সমাজে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।
তবে এই জরিপের ফল ইসরাইলের সব তরুণের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এতে মূলত প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ইহুদি তরুণদের প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থিদের প্রভাব
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবারের নির্বাচনে অন্যতম আলোচ্য বিষয়। সমালোচকদের অভিযোগ, ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছেন।
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের মতো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ইসরাইলের রাজনীতিতে ডানপন্থি অবস্থানের প্রভাব বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজা নিয়ে কঠোর নীতির প্রশ্নে এসব নেতার অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবেও সমালোচিত হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কট্টর বক্তব্য ও কঠোর নীতির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি দেশটির মূলধারার রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, এসব নেতার সমর্থকদের কাছে নিরাপত্তা, শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং কঠোর নীতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। ফলে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থি দলগুলোর সমর্থন নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে
তরুণদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
অনেক তরুণ সরাসরি তথ্য অনুসন্ধান করার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে দেখা পোস্ট, ভিডিও ও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করছেন। ফলে কোন ধরনের বক্তব্য তাঁদের সামনে বেশি আসছে, সেটিও তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকদের অনলাইন প্রচারণাও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ইতামার বেন-গভিরের মতো নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা প্রচার করে তরুণ সমর্থকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
ইসরাইলি ব্যঙ্গবিদ লিওর শ্লেইনের একটি ভিডিওও এ বিতর্ককে সামনে এনেছে। ভিডিওটিতে এক তরুণের আরববিদ্বেষী বক্তব্য প্রকাশ্যে আসে। তীব্র সমালোচনার মুখে পরে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি তরুণদের একটি অংশের মধ্যে বিদ্বেষমূলক মনোভাবের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
সব তরুণই ডানপন্থি নন
তরুণদের মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়লেও ইসরাইলের সব তরুণ একই রাজনৈতিক অবস্থানে নেই। দেশটির বামঘেঁষা ডেমোক্র্যাটস পার্টির এক সভায় অংশ নেওয়া ১৮ বছর বয়সী গিলি বলেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলি সমাজে গভীর ভয় তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব—এমন বিশ্বাস ধরে রাখা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নিরাপত্তাহীনতা ও সংঘাতের অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। কেউ কঠোর নিরাপত্তানীতির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, আবার কেউ শান্তি ও রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
অর্থাৎ, তরুণদের ডানপন্থার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা থাকলেও এর পেছনে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক প্রচারণা ও তথ্য পাওয়ার মাধ্যমের মতো একাধিক বিষয় কাজ করছে।
‘জেনারেশন রাইট’ কি ইসরাইলের রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
ইসরাইলের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থি পরিচিতির প্রবণতাকে অনেকে ‘জেনারেশন রাইট’ বা ‘ডানপন্থি প্রজন্ম’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। এই প্রবণতা আগামী দিনের ইসরাইলি রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণদের বড় অংশ যদি ডানপন্থি দলগুলোকে সমর্থন করেন, তাহলে দেশটির রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সরকার গঠনের সমীকরণে তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক, নিরাপত্তানীতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
তবে একটি জরিপের ভিত্তিতে পুরো তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। নির্বাচনে প্রকৃত ভোটের ফল, বিভিন্ন দলের প্রতি সমর্থন এবং ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই দেখাবে—ইসরাইলের রাজনীতিতে এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

