আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক ড্রোন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিংকের কিছু সেবায় গতি সীমা আরোপের পর অভিযান পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে। এ ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে রাজনৈতিক কারণে এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে স্টারলিংকের সামরিক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কিছু টার্মিনালে নতুন গতিসীমা কার্যকর হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, এতে কয়েকটি সামরিক ড্রোন অভিযান ব্যাহত হয়।
ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে সংযোগে সমস্যা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ জানান, ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা সামরিক সরঞ্জামের সঙ্গে স্টারলিংক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ইউক্রেনের সপ্তম র্যাপিড রিঅ্যাকশন কোরের এক সূত্রও সংযোগে বিঘ্নের কথা নিশ্চিত করেছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গতিসীমার কারণে কিছু অভিযান বাতিল করতে হয়েছে। রুশ লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলা চালানো এবং আকাশ প্রতিরক্ষায় দ্রুতগতির ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানান, উচ্চগতিতে চলা টার্মিনালগুলোর সংযোগ আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার স্বার্থে স্টারশিল্ডের গতিসীমা পুরোপুরি তুলে নেওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কী বললেন ইলন মাস্ক?
স্টারলিংকের মালিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, স্টারশিল্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে।
মাস্কের ভাষ্য, স্টারশিল্ডের গতি ও ব্যবহারসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও বলেন, স্টারলিংক একটি বাণিজ্যিক সেবা, যা বেসামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের কথা।
তবে ইউক্রেনের সামরিক টার্মিনালে নির্দিষ্ট গতিসীমা আরোপের সিদ্ধান্তটি ট্রাম্প সরাসরি দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ডের পার্থক্য
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড—দুটিই স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তি হলেও ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের ধরনে পার্থক্য রয়েছে।
স্টারলিংক: নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। দুর্গম অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে এটি ব্যবহৃত হয়।
স্টারশিল্ড: যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিরাপত্তা ও সামরিক চাহিদা মাথায় রেখে তৈরি স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবা। এর মাধ্যমে সরকারি ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত যোগাযোগ পরিচালিত হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট যোগাযোগের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতার কারণে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা দেশটির সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন
স্টারলিংকের সংযোগে বিঘ্নের ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক মতবিরোধের প্রভাব সামরিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় পড়তে পারে।
একই সময়ে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এসব হামলাকে বড় ধরনের আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার পর ছয় লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন।
ইউক্রেনের এক উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ মনে করেন, স্টারলিংকের সীমাবদ্ধতা আরোপের সময়টি কাকতালীয় নাও হতে পারে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি যোগসূত্র এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
স্টারলিংকের সামরিক ব্যবহার নিয়ে এ ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবা কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সেই সেবার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সামরিক অভিযানে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
