বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ তুলে জামায়াতকে সন্দেহ করছে বিএনপি। অন্যদিকে, এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের পাল্টা অভিযোগ তুলছে জামায়াত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিএনপি ও জামায়াতের এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের পেছনে গোয়েন্দা তথ্যের দাবি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে মতবিরোধকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। কখনো চারদলীয় জোট, কখনো ২০-দলীয় জোটের অংশীদার হিসেবে দল দুটির মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। পরে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয় জামায়াত।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত জামায়াত
সম্প্রতি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ দেশের বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির জন্য অর্থ সরবরাহ করছে এবং একটি রাজনৈতিক দল সেই কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও একই ধরনের অভিযোগ তুলতে শুরু করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর দাবি, ৫ আগস্টের পরপরই আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের বক্তব্য জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। তাঁর আশঙ্কা, জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের পেছনে আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকতে পারে।
বিএনপির নেতাদের মতে, সরকার পতনের আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ
বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতার প্রশ্নই আসে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে এবং দীর্ঘদিন দলটির কার্যালয় বন্ধ রেখেছিল। এমন একটি দলের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়।
উল্টো আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা ছিল বলে পাল্টা অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেলেও জামায়াতকে বিভিন্নভাবে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
জামায়াতের এই নেতার অভিযোগ, সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের বিষয়টি সামনে আনছে।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধ
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বর্তমান দূরত্বের অন্যতম বড় কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে মতপার্থক্য।
জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোট গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে বিএনপি সনদের যেসব বিষয়ে আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংবিধান সংস্কার নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। জামায়াত ও তাদের মিত্ররা সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন বা আমূল সংস্কার চায়। বিপরীতে বিএনপি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার পক্ষে।
এই মতপার্থক্যের কারণে বিরোধী দলগুলো সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে বয়কটের পথ বেছে নিয়েছে। পাশাপাশি দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন করছে তারা।
বিএনপির আশঙ্কা, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে সরকারের নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর বিরোধী দলগুলোর অনড় অবস্থানকে বিএনপি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য, একটি গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল ও বিভক্ত করার চেষ্টা হলে তাতে পরাজিত শক্তির রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আওয়ামী লীগের বক্তব্য কী?
এদিকে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে আওয়ামী লীগও দুই দলের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিমের দাবি, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ এসব দলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখছে না এবং সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনও মনে করে না বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এই অভিযোগ রাজনৈতিক কৌশল, নাকি বাস্তব কোনো যোগাযোগের ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।