নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময় স্রোতস্বিনী ছিল নেত্রকোনা শহরের মগড়া নদী। জোয়ার-ভাটায় নদীতে চলত নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় নৌযান আসত। ধান ও পাট নিয়ে ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করতেন। নদীজুড়ে ছিল স্রোত, নৌযান আর মানুষের ব্যস্ততা।

তবে সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। দখল ও দূষণে নেত্রকোনার মগড়া নদী ধীরে ধীরে নাব্যতা হারিয়ে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। পাশাপাশি বাসাবাড়ি, বাজার, কারখানা, ক্লিনিক ও পৌরসভার বর্জ্য নিয়মিত নদীতে পড়ায় দূষণও বাড়ছে।

নদীটি পুনরুজ্জীবিত করতে এবার প্রায় ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মগড়া নদীর প্রায় ৪১ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন, নেত্রকোনা শহর অংশে নদীর দুই পাড়ে হাঁটার পথ নির্মাণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগড়া

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মগড়া নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১১৬ কিলোমিটার পড়েছে নেত্রকোনা জেলায়। নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে নদীটির প্রায় সাত কিলোমিটার অংশ প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির গড় প্রস্থ প্রায় ৩৮ মিটার।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এম. এনামুল হক তাঁর Rivers of Bangladesh বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ময়মনসিংহের ফুলপুরে ধলাই নদীর দক্ষিণমুখী প্রবাহ থেকে মগড়া নদীর উৎপত্তি। পরে নদীটি নেত্রকোনা শহর, আটপাড়া ও মদন উপজেলা অতিক্রম করে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় ধনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

দখলে বিপন্ন নদী

নেত্রকোনা শহরের আনন্দবাজার থেকে পাটপট্টি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে নদীর দুই তীরে দখলের চিহ্ন দেখা গেছে। সাতপাই, নাগড়া, তেরিবাজার, ছোটবাজার, মোক্তারপাড়া, কাটলি ও পাটপট্টি এলাকায় নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) রেকর্ডে নদীর দুই তীরে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা অন্তত ৩৮১টি। আর বিএস/বিআরএস রেকর্ড অনুযায়ী এ সংখ্যা ৪৯টি। এসব দখল নিয়ে ১০৪টি উচ্ছেদ মামলা ও ২০টি দেওয়ানি মামলা রয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে শিগগিরই অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দূষণে আরও করুণ অবস্থা

দখলের পাশাপাশি মগড়া নদীর জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে দূষণ। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীরে কাঁচা শাকসবজির বর্জ্য, কারখানার বর্জ্য, ক্লিনিকের বর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। পৌরসভার ১৩টি নালা দিয়ে পানি নদীতে গিয়ে পড়ছে। কিছু এলাকার পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্যও নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফলে নদীর পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পুনঃখননে ফিরবে স্বাভাবিক প্রবাহ?

মগড়া নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে নেওয়া প্রকল্পে মোট ব্যয়ের বড় অংশই রাখা হয়েছে খননকাজের জন্য। প্রকল্পের প্রায় ৪৫৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা নয়—৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা নদী পুনঃখননে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ শহর অংশে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটার পথ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় করা হবে।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মগড়া নদী পুনঃখননের মাধ্যমে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি কৃষিজমি সুরক্ষায় নদীটি ভূমিকা রাখতে পারবে।

তিনি জানান, চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাতটি প্যাকেজে সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি নদীর জায়গা দখলমুক্ত করার বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখছে।

নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হকও জানিয়েছেন, মগড়া নদীকে দখলমুক্ত ও সংস্কার করে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।

প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা গেলে মগড়া নদী আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। তবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে শুধু পুনঃখনন নয়, দখল ও দূষণ বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version