বাণিজ্য ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার উদ্বেগে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

বাজারের অন্যতম প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ সেপ্টেম্বর ১০১.২১ ডলারে স্থির হয়। ১০ সেপ্টেম্বর সকালে লেনদেনে দাম ১০১ ডলারের কাছাকাছি ছিল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও ৯৬ ডলারের ওপরে ছিল।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। সংঘাতের কারণে ওই পথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত।

তেল সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

ফাইলের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দৈনিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ছিল প্রায় ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন ব্যারেল। মাসের শেষে তা বেড়ে ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে উঠেছিল। তবে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শিপিং ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ২ সেপ্টেম্বরের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার পার হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯ সেপ্টেম্বর ইরান ১০টি জাহাজে হামলার দাবি করে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছে। এ পাল্টাপাল্টি হামলা জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বিকল্প পথে তেল সরবরাহ

হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ কমাতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে। ইরাক তুরস্ক হয়ে ভূমধ্যসাগরে এবং সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ করছে।

তবে বিকল্প পথগুলোও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

কমছে বৈশ্বিক মজুত

তেলের সরবরাহে সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক মজুত কমে যাওয়াও বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে। একই সময়ে বৈশ্বিক তেলের মজুত প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে।

সংঘাত দীর্ঘ হলে মজুত থেকে ঘাটতি পূরণের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু মজুত সীমিত হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।

কতটা বাড়তে পারে তেলের দাম?

এখন বাজারের বড় প্রশ্ন হলো, ব্রেন্টের দাম কতদিন ১০০ ডলারের ওপরে থাকবে এবং আরও কতটা বাড়তে পারে। বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা তত কঠিন হবে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে এখনো কিছু মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় দাম একটানা দ্রুত বাড়বে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

তবে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকিই বেশি দেখা যাচ্ছে। ১০ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহে আরও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে চীনের চাহিদা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভবিষ্যৎ দামের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকার সম্ভাবনা বজায় থাকতে পারে। এর প্রভাব পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version