নিজস্ব প্রতিবেদক

অভাব তাঁদের পড়াশোনার পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারও পরিবারে খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, কারও বাবার আয় বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কারও পড়াশোনার খরচ এসেছে গরু বা হাঁস পালনের আয় থেকে। তবু দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে কক্সবাজার, রাজবাড়ী, গাইবান্ধা ও ফরিদপুরের চার শিক্ষার্থী।

তাঁদের সাফল্যের গল্প আলাদা হলেও এখন চারজনের সামনে একই প্রশ্ন—উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাড় হবে কীভাবে?

গরু পালনের ফাঁকে পড়াশোনা, জিপিএ-৫ রিফাতের

কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রিফাত। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।

রিফাতের বাবা মো. হাছান দিনমজুরি ও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে সংসার চালান। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো লবণাক্ত পানির কারণে ফসল নষ্ট হলে মাছ ধরে সংসারের খরচ জোগাতে হয় তাঁকে।

সংসারের আয় বাড়ানোর আশায় প্রায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গাভি কিনেছিলেন রিফাতের বাবা। কয়েক বছরে সেই গাভি চারটি বাচ্চা দেয়। গরুগুলোর দেখাশোনার বড় দায়িত্ব ছিল রিফাতের ওপর।

স্কুল শেষে অন্যরা যখন খেলতে যেত, রিফাত তখন গরুর জন্য ঘাস কাটত। কাজ শেষ করে ফিরে পড়াশোনায় বসত।

রিফাতের বাবা বলেন, অভাবের কারণে কয়েকবার ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ছেলের আগ্রহ ও কান্নাকাটির কারণে তা আর করা হয়নি।

পরীক্ষার সময়ও রিফাতের পরিবার অনেক সংকটে ছিল। এমনকি পরীক্ষার হলে যাতায়াতের খরচ জোগাতে তাঁর মা মুরগি বিক্রি করেছিলেন।

রিফাতের মেধা ও আগ্রহ দেখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর বেতন মওকুফ করে। একজন শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিত পড়িয়েছেন।

জিপিএ-৫ পেয়েও অনিশ্চয়তায় অথৈ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অথৈ আজাদ ওয়াজিহা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

অথৈয়ের বাবা আবুল কালাম আজাদ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে কাজ করতেন। কয়েক মাস ধরে তাঁর সেই কাজও বন্ধ। মা পলি বেগম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁদের নিজেদের কোনো বাড়ি নেই; দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।

অভাবের মধ্যেও প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা নিজে পড়াশোনা করেছে অথৈ। পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়েছে। প্রাইভেটের খরচ জোগাতে সে নিজেও মাঝেমধ্যে অন্যদের পড়িয়েছে।

অথৈয়ের স্বপ্ন একজন প্রকৌশলী হওয়া। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে এখন থেকেই দুশ্চিন্তায় সে।

অথৈ বলে, মা-বাবা অনেক কষ্ট করে তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবার অনিশ্চিত আয়ের কথা বিবেচনা করেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছে।

হাঁস পালন করে পড়ার খরচ জোগাড় করেছে ফেরদৌস

গাইবান্ধা সদরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের ফাহাদ আল ফেরদৌসের গল্প আরও কঠিন।

ভোরে নিজের পড়াশোনা শেষ করার পর হাঁসের যত্ন নিত সে। হাঁসগুলোকে পুকুরে ছেড়ে দিয়ে আবার পড়তে বসত। বিদ্যালয় থেকে ফিরে হাঁস খোঁয়াড়ে তোলার পরও চলত পড়াশোনা।

অনেক সময় সকালের নাশতাও জুটত না। তবু পড়াশোনা থামেনি। হাঁস ও ডিম বিক্রি করে খাতা, কলম ও বইয়ের খরচ জোগাড় করেছে ফেরদৌস।

তার বাবা খোরশেদ আলম আগে ঝিনাইদহের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। বর্তমানে পরিবারের তাঁর কোনো নির্দিষ্ট আয়ের উৎস নেই।

এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ফেরদৌস ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চায়। তবে তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন পড়াশোনার খরচ। সে জানে না, পরবর্তী ধাপে তার শিক্ষার দায়িত্ব কে নেবে।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন সিথীর

ফরিদপুর সদরের ডোমরাকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিথী সাহা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসকদের সাদা পোশাকে রোগীদের সেবা করার দৃশ্য তাকে আকৃষ্ট করে। তাই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছে সে।

সিথীর বাবা হারানচন্দ্র সাহা একজন মুদি ব্যবসায়ী এবং মা শিবানী সাহা গৃহিণী। সীমিত আয়ের এই পরিবারে মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় পড়ানোর খরচ নিয়ে এখন থেকেই দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।

সিথীর বাবা বলেন, কলেজের পর যদি মেয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারে, তখন শিক্ষার খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তাঁদের মতো পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন হবে।

সিথীর স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোপাল চন্দ্র দত্ত বলেন, সে অত্যন্ত মেধাবী। তবে পরিবারের একার পক্ষে তাকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলা কঠিন।

সাফল্যের পরও বড় প্রশ্ন

চার শিক্ষার্থীই দেখিয়েছে, অর্থের অভাব মেধা ও স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না। কিন্তু এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর তাঁদের সামনে এখন নতুন বাস্তবতা—কলেজ, কোচিং, বই, যাতায়াত এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার বিপুল ব্যয় কীভাবে জোগাড় হবে?

তাঁদের প্রত্যেকের স্বপ্ন আলাদা। কেউ প্রকৌশলী হতে চায়, কেউ চিকিৎসক। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিভাবান এসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। কারণ কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে যারা নিজেদের মেধার প্রমাণ দিয়েছে, অর্থের অভাবে যেন তাঁদের স্বপ্ন থেমে না যায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version