মো. তৌহিদ হোসেন
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব
নতুন দুই মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প দুটির প্রাথমিক প্রাক্কলন ছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কাজ শুরুর আগেই ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের গঠিত কারিগরি কমিটি অবশ্য এই ব্যয় বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছে।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন নয়। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগসহ বিভিন্ন প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বাস্তব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয়ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন লেখক।
লেখার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার এমআরটি-৬ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। একই সময়ে দিল্লির মেট্রো নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে তুলনামূলকভাবে অনেক কম ব্যয় হয়েছে। এই ব্যবধানের কারণ, প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি নির্বাচন, দরপত্রের শর্ত এবং পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
লেখক জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যয়ের কাঠামো ও শর্তগুলো খতিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য থাকে এবং নকশা বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরে ব্যয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মেট্রোরেল কি ঢাকার যানজটের একমাত্র সমাধান?
ঢাকার যানজট ও অপরিকল্পিত নগর পরিবহন ব্যবস্থার কারণে মেট্রোরেল প্রয়োজনীয়—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শুধু কয়েকটি মেট্রোলাইন চালু করলেই শহরের যানজট বা নগর ব্যবস্থাপনার সংকটের সমাধান হবে না।
লেখকের মতে, বর্তমানে এমআরটি-৬ ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা শহরের মোট গণপরিবহন ব্যবহারকারীর তুলনায় সীমিত। ঢাকার বড় অংশের মানুষ এখনো বাস, রিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।
তাই যানজট কমাতে মেট্রোরেলের পাশাপাশি বাসব্যবস্থা সংস্কার, রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার মতো পদক্ষেপ জরুরি।
বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক বাস
লেখক নগর পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ধাপে ধাপে হাজার হাজার বৈদ্যুতিক বাস চালু করা যেতে পারে। এতে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গণপরিবহনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
একটি সমন্বিত, অলাভজনক বা মিশ্র মালিকানাধীন নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলে বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমান বাস মালিকদের ধীরে ধীরে আন্তজেলা পরিবহন খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাবও রয়েছে।
রিকশা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা
ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত ও প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। লেখকের মতে, রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
ট্রাফিক আইন অমান্য করলে রিকশার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট রুট ও পরিচালনা কাঠামোর আওতায় আনলে নগর পরিবহন আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার তাগিদ
শহরের যানজট ও চলাচলের সংকটের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে ফুটপাত দখলের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন লেখক। তাঁর মতে, ফুটপাত মানুষের হাঁটার জন্য এবং সড়ক যানবাহনের চলাচলের জন্য নির্ধারিত। দোকান, হোটেল কিংবা অন্যান্য স্থাপনা দিয়ে এসব জায়গা দখল করা নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় সমস্যা।
তাই রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবমুক্তভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহন, রিকশা, পথচারী ও ব্যক্তিগত যানবাহনের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে লেখকের বক্তব্য হলো, ঢাকার পরিবহন সংকট মোকাবিলায় মেট্রোরেল প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের মেগাপ্রকল্পের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে তুলনামূলক কম ব্যয়ের ও বেশি মানুষকে সেবা দিতে সক্ষম গণপরিবহনব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি

