শরীরের পেশি শুধু চলাফেরা বা শারীরিক শক্তির জন্য নয়, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করলে ধীরে ধীরে পেশির পরিমাণ কমতে পারে। বাইরে থেকে শরীরের ওজন স্বাভাবিক মনে হলেও অজান্তেই ঘটতে পারে এই পরিবর্তন। আর পেশির পরিমাণ কমে গেলে বাড়তে পারে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের গ্লুকোজ ব্যবহারের অন্যতম প্রধান স্থান হলো পেশি। খাবার খাওয়ার পর কার্বোহাইড্রেট থেকে তৈরি গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে। ইনসুলিন এই গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছাতে সাহায্য করে। কোষগুলো গ্লুকোজ শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু পেশির পরিমাণ কমে গেলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ গ্রহণ ও ব্যবহারের সক্ষমতাও কমতে পারে।

পেশি কমা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা

পেশির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

‘ডায়াবেটিস অ্যান্ড মেটাবলিজম জার্নাল’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় মধ্যবয়সি ও বয়স্ক কোরীয়দের গড়ে ৯ দশমিক ০৬ বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে ১ হাজার ৩৩৬ জনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, যাদের পেশির পরিমাণ সবচেয়ে কম, তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পেশির অধিকারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শরীরের চর্বি ও কোমরের পরিধির মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এ ছাড়া ২ লাখ ৩ হাজার ৭৬৭ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা আরেকটি বড় গবেষণায় নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই পেশির পরিমাণ কম থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।

পেশি কমলে রক্তে শর্করা বাড়ে কেন?

শরীরের ইনসুলিননির্ভর গ্লুকোজ ব্যবহারের বড় একটি অংশ কঙ্কালপেশির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে পেশির পরিমাণ কমে গেলে গ্লুকোজ গ্রহণ ও ব্যবহারের সক্ষমতা কমতে পারে।

একই সঙ্গে পেশির কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়লে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স।

যেসব কারণে অজান্তেই কমতে পারে পেশি

বয়স বৃদ্ধি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে পেশির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমতে পারে।

এর কিছু লক্ষণ দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই বোঝা যায়। যেমন—সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, বাজারের ব্যাগ বহন করা কিংবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো আগের তুলনায় কঠিন মনে হওয়া।

তবে শুধু শরীরের ওজন বা গড়ন দেখে পেশির পরিমাণ কমছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। শরীর পাতলা হলেও বিপাকীয় সমস্যা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকতে পারে।

পেশির শক্তি ধরে রাখতে করণীয়

পেশির শক্তি ও পরিমাণ বজায় রাখতে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা জরুরি। স্কোয়াট, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের ব্যায়াম, ওজন নিয়ে ব্যায়াম এবং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী পুশ-আপ করা যেতে পারে।

পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক পরিশ্রম বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের দিনগুলো পরপর না রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পেশি সুস্থ রাখতে খাবারে রাখুন প্রোটিন

পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাবারে ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, সয়াবিন, মাছ এবং চর্বিহীন মাংস রাখা যেতে পারে।

পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণের পাশাপাশি নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশির রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করে।

তবে পেশির পরিমাণ কমে গেলেই যে ডায়াবেটিস হবে, এমন নয়। বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, শরীরে চর্বির পরিমাণ ও খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন বিষয় ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে।

তাই সুস্থ থাকতে শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ নয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি ও পরিমাণ ধরে রাখার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version